অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ]

অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ] : কতকিছু পাওয়ার পরও আমাদের চাহিদার শেষ নাই, তবে চোখে দেখতে না পেরেও দিব্বি ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন ‘ব্লাইন্ড’ ক্রিকেটাররা। সাধারণত পুরুষ এবং নারী এই দুই শ্রেণীর ক্রিকেটাররা দাপিয়ে বেড়ান আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায়। এর বাইরে বয়সভিত্তিক দলও আছে ক্রিকেটখেলুড়ে দেশগুলোর। এছাড়া আরেকশ্রেণীর দল আছে, এরা সাধারণত শারীরিকভাবে অক্ষম ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দল। সহজ বাংলায় যাদের আমরা ‘প্রতিবন্ধী’ বলি।

অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ]
অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ] অন্ধ ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৮
এই প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেট আবার দুইরকম। বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেট দল, যেমন কারো হাত নেই, পা নেই কিংবা মানসিকভাবে অসুস্থ। আরেকদল হচ্ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেট বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট, অর্থাৎ যারা চোখে দেখতে পারেন না তাদের ক্রিকেট। এর মধ্যে ব্লাইন্ড ক্রিকেট সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

ব্লাইন্ড ক্রিকেটারদের খেলার ফরম্যাট সক্ষম ক্রিকেটারদের মতোই। তারা তিন ফরম্যাট অর্থাৎ টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিও খেলেন। তাদের জন্য স্বাভাবিক ক্রিকেটারদের মতোই ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেরও আয়োজন করা হচ্ছে নিয়মিত। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি, সবশেষ দুই বিশ্বকাপেরই চ্যাম্পিয়ন ভারত।

আজ থেকে ৯৫ বছর আগে শুরু হয়েছিল ব্লাইন্ড ক্রিকেট। ১৯২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে সর্বপ্রথম মাঠে গড়ায় দৃষ্টিহীনদের ক্রিকেট। অস্ট্রেলিয়ায় তখন এমন একটি কারখানা ছিল সেখানে যারা ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন, অর্থাৎ চোখে সামান্য দেখতে পারতেন তারা কাজ করতেন।

তাদের মধ্যে দুজন কর্মচারী লাঞ্চের সময় টিনের কৌটার মধ্যে ছোট পাথর ভরে সেটা দিয়ে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি সে সময় অনেকের নজর কাড়ে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর ওই কারখানার অন্যান্য দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা লাঞ্চের সময় নিয়মিত কারখানার ভেতরে টিনের কৌটা দিয়ে ক্রিকেট খেলত।

Blind Cricket World Cup [ অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট ]
Blind Cricket World Cup
এর কিছুদিন বাদেই অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ায় ‘ভিক্টোরিয়া ব্লাইন্ড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৮ সালে সিডনিতে প্রথম আন্ত: প্রাদেশিক ব্লাইন্ড ক্রিকেট ম্যাচ মাঠে গড়ায়। সেবার ভিক্টোরিয়া নিউ সাউথ ওয়েলসের মুখোমুখি হয়েছিল।

এর ঠিক ২৫ বছর পরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অস্ট্রেলিয়ান ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল’। অস্ট্রেলিয়ান ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার বছর মেলবোর্নে সংগঠনটি ‘ব্লাইন্ড ক্রিকেট কার্নিভালের’ আয়োজন করে। এর ৪৩ বছর বাদে ১৯৯৬ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল’ (ডব্লিউবিসিসি)।

ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন জর্জ আব্রাহাম। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিলের ১০টি পূর্ণ সদস্য দেশ রয়েছে। তারা হল- অস্ট্রেলিয়া, ভারত, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

[ অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ] ]

শুধু প্রতিষ্ঠা করেই থামেনি, নিয়মিত বিশ্বকাপও আয়োজন করছে ব্লাইন্ডদের ক্রিকেটের অভিভাবক স্বংস্থা, ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল। ১৯৯৮ সালে প্রথম ব্লাইন্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়। নয়া দিল্লিতে আয়োজিত প্রথম আসরে পাকিস্তানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় দক্ষিণ আফ্রিকা।

এরপর ২০০২ সালে ভারতের চেন্নাইতে আয়োজন করা হয় দ্বিতীয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপ। এরপর ২০০৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজন করা হয় চতুর্থ বিশ্বকাপ। সবশেষ বিস্বকাপের আয়োজক দেশ ভারত।

শুধু ওয়ানডে বিশ্বকাপ নয়। ব্লাইন্ড ক্রিকেটারদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও আয়োজিত হচ্ছে। ২০১২ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত হয় ব্লাইন্ড টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম আসর। পাকিস্তানকে হারিয়ে প্রথম আসরের শিরোপা জিতে নেয় ভারত।

পরের আসরও ভারতে, ভারতের দিল্লিতে ২০১৭ ব্লাইন্ড টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরের চ্যামিয়ন হয়েছিল ভারত। সেখানে পূর্ণ সদস্য ১০টি দেশই খেলছে। শুধু তাই নয়- অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতে নিয়মিত ব্লাইন্ডদের ঘরোয়া ক্রিকেটও হয়।

চোখে দেখতে পেয়েও যেখানে প্রতিনিয়ত ভুল করছে ক্রিকেটাররা, সেখানে অন্ধরা কিভাবে ক্রিকেট খেলছে? এমন প্রশ্ন যে কারো মনে উঠতেই পারে। সাধারণত শব্দ শুনে তারা বুঝতে পারেন মাঠে খেলেন। ব্লাইন্ড ক্রিকেটেও রয়েছে বেশ কিছু নিয়মকানুন।

[ অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ] ]

অন্ধদের ক্রিকেট হলেও ব্লাইন্ড ক্রিকেটারদের দলের সবাই কিন্তু পুরোপুরি অন্ধ নন। দলে থাকা ১১ জন ক্রিকেটারকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। ১১ জনের মধ্যে কমপক্ষে চারজন খেলোয়াড় থাকেন পুরোপুরি অন্ধ। ৩ জন থাকেন আংশিক অন্ধ এবং বাকি চারজন খেলোয়াড় কিছুটা দেখতে পান।

এদের মাঠে খুঁজেও পাওয়া যায় খুব সহজেই। যারা একেবারেই দেখতে পান না তাদের ডান হাতে সাদা রংয়ের রিস্টব্যান্ড পড়েন বা তাদের জার্সিতে ডান হাতের উপরদিকে একটি সাদা টেপ প্যাচানো থাকে। যারা আংশিক অন্ধ তারা ডান হাতে লাল রিস্টব্যান্ড পড়েন বা তাদের জার্সিতে ডান হাতের উপর দিকে দুটি সাদা টেপ প্যাচানো থাকে। যারা কিছুটা দেখতে পান মাঠে তারা হাতে নীল রংয়ের রিস্টব্যান্ড পড়েন বা তাদের জার্সিতে ডান হাতের উপরের দিকে তিনটি সাদা স্ট্রাইপ থাকে।

খেলার নিয়মও বেশ মজার। বল করার আগে বোলার প্লে বলেন ফলে ব্যাটসম্যান তখন বুঝতে পারেন তাকে এখন ব্যাট চালাতে হবে। যারা একেবারেই দেখতে পান না, তারা ম্যাচে যত রান করবেন তার দ্বিগুণ রান নামের পাশে যোগ হবে।

তবে এই সুযোগটি নেই বাকি দুই ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের। এই দুই ক্যাটাগরির ক্রিকেটাররা এক রান করলে স্কোর বোর্ডে তাদের এক রানই লেখা হয়। বাউন্ডারি কিংবা ছক্কা মারলে নামের পাশে চার রান কিংবা ছয় রানই জমা পড়ে।

ব্লাইন্ড ক্রিকেটে বল গড়িয়ে মারা হয়। বল করার আগে বোলারকে ব্যাটসম্যানের উদ্দেশ্যে শব্দ করে বলতে হবে ‘রেডি’। প্রতিউত্তরে ব্যাটসম্যান ‘ইয়েস’ বললে তবেই বল করতে প্রস্তুত হবেন এবং বল ডেলিভারি দেওয়া আগে বলবেন ‘প্লে’।

[ অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ]]

বল গড়িয়ে না করলে সেটা নো বল হিসেবে ধরে নেয়া হয়। বোলার যদি সেটা না বলেন তাহলে ‘নো বল’ হিসেবে গণ্য হবে। ‘প্লে’ বলাটা যদি বল ছোড়ার একটু দেরিতে কিংবা একটু আগে হয় তাহলে আম্পায়ার সেটিকে ‘নো বল’ ডাকতে পারবেন। আর বলটি অবশ্যই মাঝ পিচের সামনে অথবা পেছনে একবার অথবা ক্ষেত্রবিশেষে দুইবার বাউন্স করে ব্যাটসম্যানের কাছে যেতে হবে। সেটা না হলে নো বল হিসেবে গণ্য হবে।

ব্লাইন্ডদের ওয়ানডে ক্রিকেট হয় ৪০ ওভারে। তার জন্য সময় বেধে দেওয়া হয় ৩ ঘণ্টার। এই সময়ের মধ্যে যে দল ফিল্ডিং করবে তারা তাদের ওভার শেষ করবে। তবে সময় কম হোক কিংবা বেশি উভয় দলকে ৪০ ওভার করেই বল করতে হবে।

অন্ধদের টেস্ট ম্যাচ অথবা দুই ইনিংসের ম্যাচগুলো তিনদিনের হয়। প্রতিদিন ৮০ ওভারের খেলা হয়। ৬ ঘন্টার মধ্যে এই ৮০ ওভার শেষ করতে হয়। তবে প্রতি ২৫ ওভারে কমপক্ষে ৫ ওভার করাতে হয় পুরোপুরি অন্ধদের দিয়ে।

অন্ধদের বিশ্বকাপ বা ব্লাইন্ড ক্রিকেট [ Blind cricket ] সম্পর্কে আরও পড়ুন:

আমাদের অন্যান্য আয়োজন:

মন্তব্য করুন