অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের অনবদ্য রেকর্ড

অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের অনবদ্য রেকর্ড : রিয়াল মাদ্রিদ, বিশ্ব ফুটবলের এক অন্যতম পরাশক্তি। কিভাবে হারানো বাজি নিজের নামে করতে হয় , এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো রিয়াল মাদ্রিদ। এই তো কয়দিন আগে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে ম্যাচের অন্তিম কিছু সময়ে টানা ৩ গোল করে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে উঠেছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। এবার, ফাইনালে তারকাখচিত দল লিভারপুলকে হারিয়ে ১৪ বারের মতো ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্যের মুকুট মাথায় নিলো রিয়াল মাদ্রিদ।

প্রতিশোধ নেওয়া হলো না লিভারপুলের। ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হারের বদলা নেওয়ার কথা বলছিল তারা বারবারই। কিন্তু হতাশই হতে হলো অলরেডদের।

আরও একবার ফাইনালে স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়নদের সামনে পড়ে স্বপ্ন ভাঙলো লিভারপুলের। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শনিবার রাতে দাপট দেখিয়ে খেলেও গোলের দেখা পেলেন না সালাহ-মানেরা।

বরং খেলার ধারার বিপরীতে গোল করে দলকে লিড এনে দিলেন ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়র। দুর্দান্ত সব সেভ করে নায়ক হয়ে রইলেন গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়াও। তাতেই ১-০ গোলের জয় নিয়ে রেকর্ড ১৪তম বারের মতো ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হলো রিয়াল মাদ্রিদ।

অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের অনবদ্য রেকর্ড
চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি চুমু খাচ্ছেন রিয়াল গোলকিপার থিবো কর্তোয়া

ম্যাচের পরিসংখ্যান দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। লিভারপুলের আক্রমণের সামনে রীতিমত কোণঠাসা ছিল রিয়াল। মোট ২৪টি শট নেয় লিভারপুল, যার ৯টি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে মাত্র ৪ শটের দুটি লক্ষ্যে রাখতে পেরেছিল রিয়াল। একটিতে তারা গোল আদায় করে নেয়, অন্য শটও জালে জড়িয়েছিল। অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায়।

[ অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের অনবদ্য রেকর্ড ]

মাঠজুড়ে দাপিয়ে খেললো লিভারপুল আর সুযোগের পুরোটা কাজে লাগিয়ে শেষ হাসি হাসলো রিয়াল। কার্লো আনচেলত্তির ট্যাকটিসের কাছে হার মানলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ।

সমর্থকদের মাঠের বাইরের ঝামেলায় ৩৬ মিনিট দেরিতে শুরু হয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। প্যারিসে ম্যাচটিতে প্রথমার্ধে লিভারপুলের আক্রমণের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি রিয়াল। তবে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন থিবো কর্তোয়া।

ম্যাচের ১৬ মিনিটের মাথায় মোহামেদ সালাহর ক্লোজ রেঞ্জ শট বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে ফেরান রিয়াল গোলরক্ষক। ২১ মিনিটে সাদিও মানে তো গোলই পেয়ে যাচ্ছিলেন প্রায়, এবারও কর্তোয়ায় বেঁচে যায় রিয়াল। তার হাতে সরানো বল গিয়ে লাগে পোস্টে।

৪২ মিনিটে সতীর্থের বাড়ানো থ্রো বল একদম এলিসনের সামনে পেয়ে গিয়েছিলেন বেনজেমা। দুই তিনবার লিভারপুল গোলরক্ষককে কাটিয়ে শট নেওয়ার জায়গা পাননি, পড়ে যাওয়ার সময় আলতো করে বল ঠেলে দেন ভালভার্দের দিকে।

ভালভার্দেও ঠিকমতো শট নিতে পারেননি, বল গড়িয়ে আবার চলে যায় বেনজেমার পায়ে। এবার আর ভুল করেননি ফরাসি ফরোয়ার্ড, জড়িয়ে দেন জালে।

কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি পায়নি রিয়াল। ‘ভার’-এ সিদ্ধান্তটি নিতে অনেক সময় লেগেছে রেফারির। শেষ পর্যন্ত গোলটি বাতিল করেন তিনি। গোলশূন্য ড্র নিয়ে বিরতিতে যায় দুই দল।

দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধারা ধরে রাখে লিভারপুল। রিয়ালের ত্রাতা ছিলেন সেই কর্তোয়া। ৫৪ মিনিটে আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের শট ঝাঁপিয়ে পড়ে এক হাতে বের করে দেন রিয়াল গোলরক্ষক। এর কিছুক্ষণ পরই খেলার ধারার বিপরীতে গোল তুলে নেয় আনচেলত্তির দল।

৫৯ মিনিটে ভালভার্দের পাস বক্সের মাঝে বেনজেমাকে পার করে খুঁজে পায় ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে। আলতো ছোঁয়ায় সেটি জাল ঠেলে দেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। ১-০তে এগিয়ে যায় রিয়াল।

গোল শোধে মরিয়া লিভারপুল আক্রমণের পর আক্রমণ করতে থাকে। ৬৪ মিনিটে সালাহর বাঁ পায়ের বুলেট গতির শট ঝাঁপিয়ে পড়ে ফেরান কর্তোয়া। ৮২ মিনিটে বল পায়ে নিয়ে গিয়ে কর্তোয়াকে একা পেয়ে গিয়েছিলেন মিসরীয় ফরোয়ার্ড।

এবারও অতিমানবীয় এক সেভ করেন রিয়াল গোলরক্ষক। সালাহর ডান পায়ের শট চোখের পলকে এক হাতে কোনোমতে বাইরে বের করে দেন কর্তোয়া। আরও একবার নিশ্চিত বিপদ থেকে বাঁচে রিয়াল।

অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের অনবদ্য রেকর্ড
চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি হাতে ভিনিশিয়াস জুনিয়র

শেষ পর্যন্ত আর গোলের দেখা পায়নি লিভারপুল। প্রতিশোধও নেওয়া হয়নি তাদের। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের একমাত্র গোলে শিরোপা উৎসবে মাতে রিয়াল।

এ নিয়ে টানা তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের ফল নির্ধারণ হলো ১-০ গোলের ব্যবধানে। এর আগে ১৯৭৭-৭৮ থেকে ১৯৮২-৮৩ মৌসুমে টানা ছয়টি ফাইনালের ফল হয়েছিল ঠিক ১-০ গোলের ব্যবধানে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে লিভারপুল কোচের এটি তৃতীয় পরাজয়। ইতালিয়ান কোচ মার্সেলো লিপ্পির পর মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে এই তিক্ত স্বাদ পেলেন ক্লপ। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে ২০১৩ এবং লিভারপুলের হয়ে ২০১৮ ও ২০২২ সালের ফাইনাল হারলেন ক্লপ।

অন্যদিকে রিয়াল কোচ কার্লো আনচেলত্তি গড়েছেন নতুন ইতিহাস। প্রথম কোচ হিসেবে চারটি ইউরোপিয়ান কাপ শিরোপা জিতলেন তিনি। ২০০৩ ও ২০০৭ সালে এসি মিলান এবং ২০১৪ ও ২০২২ সালে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন তিনি। খেলোয়াড়ি জীবনেও দুইবার ইউরোপিয়ান কাপ শিরোপা জিতেছেন আনচেলত্তি।

অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের অনবদ্য রেকর্ড
চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি হাতে মার্সেলো

রিয়ালের একঝাঁক খেলোয়াড় স্পর্শ করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর রেকর্ড। এতোদিন ধরে পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে রোনালদো এককভাবে সবার ওপরে ছিলেন। এবার তার সঙ্গে যোগ দিলেন লুকা মদ্রিচ, মার্সেলো, দানি কারভাহাল, ইস্কো অ্যালার্কন, গ্যারেথ বেল, ক্যাসেমিরো, টনি ক্রুস ও নাচো।

শনিবার রাতের ফাইনালে নয়টি শট ঠেকিয়েছেন রিয়াল গোলরক্ষক কর্তোয়া। ২০০৪ সাল থেকে গোল ঠেকানোর পরিসংখ্যান সংরক্ষণের পর থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে এতো শট ঠেকাতে পারেনি কেউ। এছাড়া পুরো আসরে কর্তোয়ার ৫৯টি শট ঠেকানোও নতুন রেকর্ড।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন