অভিষেক এভাবেও হয়?

অভিষেক এভাবেও হয়? পাড়ার ক্রিকেটে খেলেছেন নিশ্চয়ই? পাড়ার একাদশে সুযোগ পাননি, তবুও মাঠে ছুটে গিয়েছেন নিশ্চয়ই। আমার লেখা যখন পড়ছেন আমি ধরেই নিচ্ছি আপনি যথেষ্ঠ ক্রীড়াপ্রেমী। ক্রিকেটকে ভালোবাসায় দলে না থাকলেও দলের সমর্থনে মাঠে ছুটে যাওয়া, দলকে সমর্থন দেওয়া- এটা তো নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। অন্তত ক্রিকেটকে ভালোবাসা কোনো কিশোরের জন্য।

অভিষেক এভাবেও হয়?, ক্রিকেটে অভিষেক
পমার্সব্যাক, Luke Pomersbach, [ক্রিকেটে অভিষেক এভাবেও হয়]
এবার একই ঘটনার ভিন্ন প্রসঙ্গে যাওয়া যাক, পাড়ার দলের ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে গেছেন আর সেখানে দলের কোনো ক্রিকেটার খেলতে আসেননি এমনটাও তো ঠিকই দেখেছেন। আপনার সঙ্গে হয়েছে কিনা জানা নেই, তবে বাংলাদেশের হাজার হাজার কিশোর প্রথমবার পাড়ার দলে সুযোগ পেয়েছেন অন্য একজন ক্রিকেটার খেলতে না আসায়। সেই সুযোগটা অনেকে লুফে নিয়েছেন, অনেকে হারিয়ে ফেলেছেন চিরতরে। অনেকে হারিয়েছেন সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে না পারায়, অনেকে হারিয়েছেন ভাগ্যের ফেরে।

যদি বলি পাড়ার ক্রিকেটের এমন দৃশ্য দেখা গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, তাহলে কি বিশ্বাস হবে? যদি বলি একজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতিতে হুট করে ডেকে এনে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, গাল গপ্পো ভাববেন না তো? তবে ঘটনাটা আসলেই ঘটেছে, সেটাও যেন তেন দলের সঙ্গে নয়! দলটার নাম অস্ট্রেলিয়া, খেলোয়াড়ের নাম লুক পমার্সব্যাক।

তবে ঘটনা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ঘটনার কেন্দ্রে, বেশ পেছনে। ঘটনাটা ২০০৭ সালের, সবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। কুড়ি ওভারের এই ফরম্যাটটা তখন পুরো বিশ্বে জনপ্রিয় হতে শুরু করছে। ততদিনে সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে পাওয়ার হিটার হিসেবে ভালোই নাম কামিয়েছেন পমার্সব্যাক। সঙ্গে সেই মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ান এই ব্যাটসম্যান ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। এরই মধ্যে পাঁচ ইনিংসে করে ফেলেছেন ৩৯৫ রান, গড় প্রায় একশ ছুঁইছুঁই। পমার্সব্যাক এই সাফল্যের আনন্দে সিদ্ধান্ত নিলেন একটু মদ্যপান করবেন, সঙ্গী হিসেবে নিলেন শন মার্শকে। মার্শও ততদিনে এই ফরম্যাটে ভালই জনপ্রিয় ক্রিকেটার।

কোনোকিছুই আসলে অতিরিক্ত ভালো না, অতিরিক্ত মদ্যপানও না। সেদিন দুজনে একটু বেশিই পান করে ফেললেন। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বরাবরই শৃংখলা নিয়ে সচেতন, সেই ধারা তাদের রাজ্য দলেও বহমান । অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে দুজনকেই প্রথম একাদশ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহিষ্কৃত করা হয়। দল থেকে ছিটকে গেলেন, তবে ক্রিকেট থেকে নয়। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ২য় একাদশের হয়ে খেললেন ভিক্টোরিয়ার ২য় একাদশের বিপক্ষে। ৯৭ বলে করলেন ১১৫, ভিক্টোরিয়া হারল ইনিংস ব্যবধানে। এর মধ্যে চ্যাপেল-হ্যাডলি ট্রফি খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছে নিউজিল্যান্ড। পমার্সব্যাক সুযোগ পেলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া চেয়ারম্যান একাদশের হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার। ৬৫ বলে করলেন ৮৮, তার এমন ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ড হারল ৭ রানে।

ক্রিকেটে অভিষেক
পমার্সব্যাক

চ্যাপেল-হ্যাডলি ট্রফি শুরু হওয়ার আগে ১১ ডিসেম্বর পার্থের ওয়াকাতে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। পমার্সব্যাক দলে সুযোগ পাননি, দলে সুযোগ পাওয়ার কথা ভাবেনও নি। তাই ভাবলেন মাঠে বসেই ম্যাচ দেখবেন। মাঠে চলে এলেন, সঙ্গী হিসেবে সাথে নিলেন বান্ধবীকে। তখনও আশাও করেননি এই খেলা দেখতে আসা তার জন্য একপ্রকার আশির্বাদ হয়ে উঠবে!

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অজি শিবিরে বাঁধলো আরেক ঝামেলা। অস্ট্রেলিয়া টিম ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা করেছে পেসার স্টুয়ার্ট ক্লার্ককে বাদ দেবে। উলটো ম্যাচের আগে ওয়ার্ম-আপ করার সময় কাঁধে চোট পেলেন ব্যাটসম্যান ব্র‍্যাড হজ। অজিরা পড়ল বিশাল সমস্যায়, তাদের খেলাতে হবে অ্যাডাম গিলক্রিস্টসহ পাঁচ ব্যাটসম্যান আর ছয় বোলার। যেখানে অধিকাংস দল চারজন বোলার আর এক দুইজন অলরাউন্ডার দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়, সেখানে ছয় বোলার নিয়ে মাঠে নামা তো অসম্ভবই। ম্যানেজমেন্ট জানতে পারলো পমার্সব্যাক খেলা দেখতে এসেছে, তাদের মাথায় তখন এই বাঁহাতিকে দলে ঢুকানোর ভাবনা।

যেই ভাবনা সেই কাজ, পমার্সব্যাক কাছাকাছিই আছে জেনে এক বন্ধুর মাধ্যমে টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে ডেকে পাঠালো। পমার্সব্যাক তখন রসিকতা ভেবে উড়িয়ে দিলেন, কিন্তু যখন ভাবলেন সত্যি তখন তড়িঘড়ি করে রওনা দিলেন ড্রেসিংরুমের উদ্দেশ্যে। একেই সঙ্গে নেই কিটব্যাগ, থাকবেই বা কী করে! কোনদিন কোন ক্রিকেটার খেলা দেখতে গেছে কিটব্যাগ নিয়ে? শুধুই তাই নয়, তিনি নাকি গাড়ি লক করে আসতেই ভুলে গিয়েছিলেন।

অভিষেক এভাবেও হয়? পমার্সব্যাক
পমার্সব্যাক

কিটব্যাগ নেই দেখে তার ভাই গ্যাভিন দৌঁড়ে গেলেন কিট আনতে। কিন্তু গ্যাভিনের ওয়াকাতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে বেশ দেরি হয়ে গেছে৷ ততক্ষণে মাইকেল ক্লার্ক টসে জিতে ব্যাটিং নিয়ে ফেলেছেন। অ্যাডাম ভোজেস, অ্যাশলি নফকে আর শন টেইটের সাথে অভিষেক হয়েছে পমার্সব্যাকেরও। ম্যাচের তারিখ ১১ ডিসেম্বর, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে তখনও আরও তিনদিন বাকি। অর্থাৎ, রাজ্যদলের হয়ে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন পমার্সব্যাক। অবাক করা ব্যাপারই বটে!

ব্যাটিংয়ের সুযোগ যখন পেয়েছিলেন, ইনিংসের তখন বিশ বল বাকি। কিন্তু সঙ্গে কিটব্যাগ তো নেই, অগত্যা কী আর করার! যার জায়গায় অভিষেক, সেই ব্র্যাড হজের কিট ধার নিয়েই নেমে পড়লেন ব্যাটিংয়ে। এমনকি তার নামে তো জার্সিও হয়নি। তবে অভিষেকটা কিন্তু খারাপ হয়নি৷ মার্ক গিলেস্পিকে মারা ছয়ে শেষদিকে নেমে ৭ বলে ১৫। অস্ট্রেলিয়ার রান ৪ উইকেটে ১৮৬, নিউজিল্যান্ড নয় বল বাকি থাকতে ১৩২ রানে অলআউট, অস্ট্রেলিয়া জিতল ৫৪ রানে। ওটাই পমার্সব্যাকের শুরু আর শেষ! এমন উদ্ভট অভিষেকের পর আর অস্ট্রেলিয়ার জার্সি গায়ে চাপানো হয়নি তার। অর্থাৎ নিজের নামের অস্ট্রেলিয়ার জার্সি পরা আর হয়ে ওঠেনি তার। উদ্ভট অভিষেক, আর পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই ছিল উদ্ভট উদ্ভট বিতর্ক

আইপিএলে বিতর্কে জড়িয়ে প্রথম নাম কামান, ২০০৮ ও ২০০৯ সালের আইপিএলে খেলেছিলেন কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের হয়ে। ২০১১ তে চলে যান রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরে। এই দলে থাকতেই ২০১২ সালে তার আইপিএল ক্যারিয়ার খাদের কিনারায় এসে পৌঁছায়। বর্তমান দিল্লি ক্যাপিটালস আর তৎকালীন দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর এই ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে এক মার্কিন মহিলা এবং তার হবু স্বামীকে পমার্সব্যাক মারধর করার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পমার্সব্যাককে আটক করে দিল্লি পুলিশ। দিল্লির একটি আদালতে হাজিরা দেওয়ার পর আদালত তাকে অন্তবর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করে। তবে টুর্নামেন্টের অবশিষ্ট অংশ থেকে পমার্সব্যাককে নিষিদ্ধ করা হয়।

যদিও পরের মৌসুমেই অবশ্য তৎকালীন কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব আর বর্তমান পাঞ্জাব কিংস ৩ লাখ ডলারে কিনে নেয় তাকে। ওটাই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ছিল তার শেষ সিজন। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি আইপিএলে খেলেছেন। মোট ১৭টি ম্যাচে মাঠে নেমেছেন, একটি অর্ধশতকে ১২২.৭৬ স্ট্রাইক রেটে তিনি ২৭.৪৫ গড়ে মোট ৩০২ রান করেন। ২০১৪ সালে মানসিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ক্রিকেট ছাড়লেন পমাসবার্ক।

[ অভিষেক এভাবেও হয়? ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন