অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা

অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা : অলিম্পিক গেমসকে পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রীড়া ইভেন্ট বলা হয়। ১৮৯৬ সালের পর আধুনিক অলিম্পিকসের যাত্রা শুরু হয়। এর আগে প্রাচীন গ্রীসে বহুবছর আগেই প্রাচীন  অলিম্পিক গেমস খেলা হতো। মূলত, প্রাচীন গ্রীসেই অলিম্পিক গেমসের সূচনা ঘটে। সেই সূচনা লগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং সম্মানজনক ক্রীড়া ইভেন্ট হলো অলিম্পিক গেমস।

অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা
২০০৬ শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

এখন পর্যন্ত, অলিম্পিক গেমসের মোট ৩২টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক ৪ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় এ অলিম্পিক গেমস। অলিম্পিক গেমস মূলত দুই প্রকার। একটি হলো শীতকালীন অলিম্পিক এবং আরেকটি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক।

অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা
প্রাচীন অলিম্পিকের একটি দৃশ্য

গ্রীক দেবতা জিউসের সম্মানার্থে প্রাচীন গ্রীসের বিভিন্ন নগর-রাজ্যের অংশগ্রহণে অলিম্পিক গেমস   আধুনিক গ্রীসে অনুষ্ঠিত হত। এতে মূলত বিভিন্ন দৌড়বাজীর প্রতিযোগিতা হত। অলিম্পিক গেমসের উদ্ভব সম্পর্কে নানা জনশ্রুতি এবং কিংবদন্তি আছে, তবে ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে করা হয় ৭৭৬খৃঃপূঃ-তে গ্রীসের অলিম্পিয়ায় এই খেলার সূচনা হয়। এরপর এই খেলা প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হত।

[ অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা ]

এই সময়কালকে অলিম্পিয়াডও বলা হয়। প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলার পর ৩৯৪খৃঃ ষষ্ঠ রোমান সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসাবে খৃষ্টীয় মতবাদ প্রবর্তন করতে চেয়ে এই খেলা বন্ধ করে দেন। মানব সভ্যতার উষালগ্নের প্রাচীন গ্রিস বিভক্ত ছিল অনেক গুলো স্বাধীন নগররাস্ট্রে। উল্লেখযোগ্য নগর রাস্ট্র গুলো ছিল স্পার্টা, এথেন্স, ডেলফি,করিন্থ, থিবিস, আরগোস প্রভৃতি । সে সময়ে নগর রাস্ট্রগুলো একে অপরের সাথে প্রায়ই যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকত। অলিম্পিক চলাকালীন অলিম্পিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হত যাতে প্রতিযোগীরা নির্ভয়ে স্ব-স্ব দেশ থেকে এসে অলিম্পিকে অংশ নিতে পারে।

বিজয়ীর মাথায় পরিয়ে দেওয়া হত লরেল পাতার মুকুট। ক্রমে অলিম্পিক নগর-রাজ্যগুলির পরস্পরের উপরে ক্ষমতা জাহির করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। একদিকে যেমন খেলা চলাকালীন রাজনীতিকরা রাজনৈতিক মৈত্রীর কথা ঘোষণা করতেন, তেমনি, যুদ্ধকালে পুরোহিতেরা ঈশ্বরের কাছে জয়কামনায় বলি চড়াতেন। এই খেলার মাধ্যমে গ্রিক সংস্কৃতিও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রসার পায়।
অলিম্পিক শুধু মাত্র ক্রীড়ার উৎসব ছিল না, এখানে একাধারে ধর্মীয় ও শিল্পকলার উৎসবও হত। ৪৩৫ খৃস্টপূর্বাব্দে অলিম্পিয়ায় নির্মিত হয় সিংহাসনে বসা হাতির দাঁত এবং সোনার তৈরী দেবরাজ জিউসের মুর্তি, যা ছিল প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য্যের অন্যতম। আজ আর সে মূর্তি নেই। হবু পৃষ্ঠপোষকদের আশায় ভাস্কর ও কবিরা এখানে সম্মিলিত হয়ে নিজ নিজ কলার প্রদর্শনী করতেন।
প্রাচীন অলিম্পিক আজকের অলিম্পিকের থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। অনেক কম বিভাগ ছিল, এবং শুধুমাত্র স্বাধীন, গ্রীকভাষী পুরুষই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারত; যদিও বিলিস্টিচ নামের এক মহিলার নাম বিজয়ী হিসাবে পাওয়া যায়। ঐ তিন শর্তপূরণ হলে যে কোনো দেশের প্রতিযোগী এই গেমসে অংশ নিতে পারত। এই খেলা আজকের মত এক এক বছর এক এক স্থানে না হয়ে প্রতি চার বছর অন্তর অলিম্পিয়াতেই অনুষ্ঠিত হত। তবে একটা ব্যাপারে প্রাচীন ও আধুনিক অলিম্পিক গেমসের মধ্যে মিল আছে – বিজয়ী প্রতিযোগীরা আজও সমধিক সম্মানিত, প্রসংশিত ও সম্বর্ধিত।
তাদের কীর্তি ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও নথিবদ্ধ হয় যাতে আগামী প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হতে পারে।৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলার পর গ্রিসের শাসক থিওডোসিয়াস পৌত্তলিকতার দোষ দিয়ে অলিম্পিক বন্ধ করে দেয়। এরপর ১৮৯৬ সালে ফ্রান্সের পিয়েরে দে কুবার্তিন আধুনিক অলিম্পিকের সূচনা করেন যা ঐ সালের ৬ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলে।
অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা
১৯৮৬ অলিম্পিক গেমসের একটি দৃশ্য

১৯২০ সালে অ্যান্টওয়ার্পে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে প্রথম অলিম্পিক পতাকা উড়ানো হয় যেটি ১৯১৩ সালেই নকশা করা হয়েছিল। পতাকার ৬টি রঙ- সাদা জমিনের উপর নীল, হলুদ, কালো, সবুজ ও লাল বৃত্ত সব দেশের জাতীয় পতাকাকে তুলে ধরেছে। প্রতিযোগীদের অলিম্পিক শপথ করানোও শুরু হয় এই অলিম্পিক থেকে।

১৯২৮ সালে গ্রিসে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে নতুন কিছু নিয়ম চালু হয়। বর্ণ ক্রমানুসারে অংশগ্রহণ করা দেশগুলো প্যারেড করে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে এবং স্বাগতিক দেশ সবার শেষে প্রবেশ করে।

১৯৩৬ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে সূচনা হয় অলিম্পিক মশালের। গ্রিসের অলিম্পিয়ায় প্রজ্বলিত অলিম্পিক আগুন থেকে শুরু করে এই মশাল যাত্রা করে বার্লিন পর্যন্ত। প্রায় ৩ হাজার প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে এই অলিম্পিক মশাল রিলেতে।

যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সালে। একই দিনে জন্মগ্রহন করা ‘হিরোশিমা’ বলে খ্যাত ইয়োসিনোরি সাকাই অলিম্পিক মশাল নিয়ে প্রবেশ করে টোকিওর স্টেডিয়ামে। ১৯৬৪ সালের এই অলিম্পিক গেমস প্রথম এশিয়াতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমস।

১৯৯২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে বার্সেলোনার তীরন্দাজ এন্টোনিও রোবোলো অলিম্পিক মশাল হাতে নিয়ে প্রজ্বলন করেননি। তিনি তীর-ধনুক দিয়ে একটি আগুনের শিখা ছুঁড়ে মারেন এবং নিখুঁতভাবে আরেকজন অলিম্পিক কর্তা সময়মত আগুনের পাত্রটিতে অগ্নিসংযোগ করেন।

অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা
২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের উদ্বোধনী দৃশ্য

১৯৯৬ সালে কিংবদন্তী বক্সার মুহম্মদ আলী অলিম্পিক আগুন প্রজ্বলিত করেন। যদিও তিনি সে সময় কিছুটা বিতর্কিত ছিলেন কিন্তু মুসলিম বিশ্বের নায়ক হিসেবে খ্যাত আলী একটি আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দেন।

২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে চীন ঘোষণা দেয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার। এই অনুষ্ঠানে ঠিক ২০০৮ জন পারকাশন বাদক আলোকিত স্টিক দিয়ে চীনের ঐতিহ্যবাহী ফৌ ড্রামস বাজায়। তিন ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে প্রায় ১৪ হাজার শিল্পী অংশগ্রহণ করেছিল।

২০১২ সালের অলিম্পিকে রাণী এলিজাবেথ প্রথম কোন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দুইবার অলিম্পিক গেমস উদ্বোধন করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি এর আগে ১৯৭৬ সালে মন্ট্রিলে কানাডার রাণী হিসেবে অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধন করেছিলেন

আরও পড়ুন:

“অলিম্পিক গেমসের ইতিকথা”-এ 6-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন