আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল; যে লড়াই মুগ্ধ করে বাঙ্গালিদেরও

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল; যে লড়াই মুগ্ধ করে বাঙ্গালিদেরও : এই মুহুর্তে আপনি কোথায় আছেন? অর্থাৎ কোথায় বসে লেখাটা পড়ছেন? ধরে নিলাম বাংলাদেশেই আছেন, আর বাংলাদেশের কোথাও বসে লেখাটা পড়ছেন। আপনি যদি ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সমর্থক হন, তবে আপনার কাছে প্রশ্ন আপনি কি জানেন বাংলাদেশ থেকে দেশ দুটোর দূরত্ব কতটা?

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল
নেইমার মেসির আলিঙ্গন

দূরের লাতিনের দেশ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, তবুও তাদের সবথেকে বেশি সমর্থক বোধহয় এই উপমহাদেশেই। বাংলাদেশ থেকেও তারা পায় আকুন্ঠ সমর্থন। কোনো কিছু পাওয়া না পাওয়ার শর্ততে দলের সমর্থন দিয়ে যায় কোটি কোটি বাঙালি। বাংলাদেশ থেকে যে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দেশ দুটোর দূরত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার কিলোমিটার, তখন তো বলাই যায় ভালবাসা দূরত্ব মানে না।

ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় লড়াই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের লড়াই, নিঃসন্দেহে একথা বলাই যায়। এ কারণেই এই মহারণকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপার ক্ল্যাসিকো’। এই তো মাসখানেক আগের কথা, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মুখোমুখি দুদল। ওটাই তাদের সর্বশেষ দেখা। কিন্তু সেই দেখা আর হলো কই? মাঠের লড়াই চলল মাত্র ৫ মিনিট, করোনা সংক্রান্ত জটিলতায় ব্রাজিল সরকারের হস্তক্ষেপে শেষমেশ ম্যাচটাই পন্ড।

মাঠের লড়াইয়ে উত্তাপ ঠিকই ছড়িয়েছে সেদিন, তবে মাঠের বাইরে ছিল না তার ছিটে ফোটাও। টানেলে প্রিয় বন্ধু নেইমারের সঙ্গে মেসির খুনসুটি, আলিঙ্গনের ছবি তো সবাইই দেখেছে। সাবেক সতীর্থ আর বন্ধু দানি আলভেজের সঙ্গে মেসির আড্ডা তো সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল। তবে তাতে ঠিকঠাক আঁচ করা যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচের উত্তেজনা।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, যে লড়াই মুগ্ধ করে বাঙ্গালিদেরও

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের উত্তেজনা যে শুধুই মাঠে চলে তা নয়, মাঠের বাইরে চলে কথার যুদ্ধ। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ইন্সটাগ্রামে চোখ রাখলে এতদিনে তা আপনার জেনে যাবার কথা। অলিম্পিকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল কোপাজয়ী আর্জেন্টিনা, সে ম্যাচের পর আর্জেন্টিনাকে উদ্দেশ্য করে স্টোরি পোস্ট করেন ব্রাজিলিয়ান তারকা রিচার্লিসন।

হারলেও আর্জেন্টাইনরাও কম যান না! কোপা ফাইনালে বারংবার আর্জেন্টাইনদের কাছে ভূপাতিত হন রিচার্লিসন, গুগল থেকে সেই ছবি নিয়ে একে একে তা ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করতে থাকেন দি মারিয়া, দি পলরা।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মাঠের উত্তেজনা বুঝতে আরেকটু পেছনে যেতে হচ্ছে, এবারের কোপা আমেরিকা ফাইনালে। ম্যাচ শেষে নেইমার-মেসির আলিঙ্গন, সিঁড়িতে মেসি-নেইমার-পারাদেসের আড্ডাকে অনেকেই আখ্যা দিয়েছেন ফুটবলের সৌন্দর্য্য নামে।

তবে সেই ম্যাচে মাঠে যে উত্তাপ ছড়িয়েছে তাতে মাঠের বাইরের এসব খুনসুটি ম্লান হয়ে গেছে। ম্যাচে নেইমারকে মার্ক করে খেলেছিলেন রদ্রিগো দি পল। নেইমারের পায়ে যখনই বল গেছে তখনই বল ছিনিয়ে নিয়েছেন দি পল। যখন নেইমারের স্কিলের সঙ্গে মার খেয়েছেন, ট্যাকল করে সেই বল রেখেছেন। তাও এক দুইবার নয়, একদম পুরো ম্যাচে।

শুধুই আর্জেন্টাইনরা নন, বল আটকাতে ফাউলের আশ্রয় নিয়েছেন ব্রাজিলিয়ানরাও। মন্ট্রিয়েল তো ম্যাচের মধ্যেই রক্তাক্ত হয়েছেন। এই লড়াইয়ের ইতিহাস যে বেশ পুরোনো, যার বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। ইতিহাসে সর্বপ্রথম আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মুখোমুখি হয় ১৯১৪ সালে।

ঘরের মাঠে সেবার ৩-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। ‘সর্বশেষ’ দেখাতেও ১-০ গোলের জয় আর্জেন্টাইনদের, সেটা ব্রাজিলের মাঠে কোপা আমেরিকা ফাইনালে। সর্বশেষ বলছি কেননা পুরো ৯০ মিনিট খেলা হয়েছে সেই কোপা ফাইনালেই।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মাঠ কিংবা মাঠের বাইরের উত্তেজনার গল্প তো বললাম, এবার আসা যাক উদাহরণে। খালি বললে তো আর বিশ্বাস করবেন না তাই না? শুরুটা হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। সেবার এক আর্জেন্টাইন সমর্থক ব্রাজিলিয়ানদের উদ্দেশ্যে বর্নবাদী মন্তব্য করে বসেন।

বর্নবাদ কতটা ভয়াবহ আপনার বোধহয় জানাই আছে, না থাকলেও সমস্যা নেই। শ্যাম বর্ণের কোনো বন্ধুকে ‘কালো’ বলেই দেখুন, তার অভিব্যাক্তিই আপনাকে বাকিটা বুঝিয়ে দিবে।সেই বর্নবাদী মন্তব্যের জের ধরেই শুরু হয় হট্টগোল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয় গোলশূন্যভাবে।

অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে তেতে ওঠে আর্জেন্টিনা দল, মুহুর্তের মধ্যে ব্রাজিলের জালে দেয় ২ গোল। একেই ব্রাজিলিয়ানদের মনে ক্ষোভ, তার উপরে দুই গোল খেয়ে বসে আছে। সোজা বাংলায় আমরা যেটাকে বলি অজুহাত, সেই অজুহাত দেখিয়ে মাঠ ছাড়ে সেলেসাওরা। আর্জেন্টাইনদের একটা গোল বিতর্কিত দাবী করে ম্যাচ শেষের আগেই মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল।

দুই বছর পরের ঘটনা আরো ভয়াবহ! সেবার পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টাইনরা! ম্যাচে তখন ২-২ গোলে সমতা। তখন হঠাৎ-ই পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি আলবিসেলেস্তেদের। তাই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় তারা। তবে কোনোকিছুতেই কোনো লাভ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে মাঠ ছাড়ে আকাশি-সাদারা। পুলিশ পাহারায় মাঠ ছাড়ে তারা। কোনো অবস্থাতেই আর্জেন্টিনা আর মাঠে নামেনি, ফলে গোলকিপার ছাড়াই ফাঁকা জালে গোল দিয়ে জয় পায় ব্রাজিল।

মাঠের যুদ্ধ কখনো কখনো ছড়িয়ে পড়েছিল মাঠের বাইরেও। যদিও সেটা মাঠের লড়াইয়ের প্রয়োজনেই। বিশ্বকাপে দুইদল মুখোমুখি হয়েছে তিনবার, যার সবশেষ ১৯৯০ সালে। সে ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হারে ব্রাজিল।

ম্যাচ হারার পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ব্রাঙ্কো দাবি করেন আর্জেন্টাইন কোচিং স্টাফ তাকে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খেতে দিয়েছিল। সে ঘটনা আবার এক টিভি সাক্ষাৎকারে ফাঁস করেন দিয়েগো ম্যারাদোনা। যদিও আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্থা তা অস্বীকার করেছিল। ম্যাচটি ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল নামে বিখ্যাত।

পরের বছর কোপা আমেরিকা ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুইদল। সে ম্যাচকে বিখ্যাতের থেকে কুখ্যাত বলাই শ্রেয়! দুদল মিলে লাল কার্ড দেখে ৫টা! ব্রাজিল ৮ আর আর্জেন্টিনা ৯ জন নিয়ে শেষ করে নির্ধারিত খেলা। ৩-২ গোলে জয়ী হয় আর্জেন্টিনা। মাঠের এমন লড়াইয়ের কারণে সে ম্যাচকে বলা হয় ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’।

দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁঝ কতটা তা প্রমাণ করে ম্যারাদোনার বিখ্যাত উক্তি,

“অন্য যেকোন দেশের চেয়ে আমার দেশ ব্রাজিলকে হারাতে বেশি ভালোবাসে। ব্রাজিলকে হারানোর চেয়ে সুন্দর কিছু নেই”

[ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল; যে লড়াই মুগ্ধ করে বাঙ্গালিদেরও ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন