ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র [ Zlatan Ibrahimovic ]

ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র [ Zlatan Ibrahimovic ] : বাংলাদেশের সমাজে উদ্ধতদের বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কেউ পান ‘বেয়াদব’ উপাধী, কারো কপালে জোটে অসভ্য, ইতরের মতো বিশেষণ। সাধারণত এই সমাজের ধ্যান-ধারণাই এমন যে, যেকোনো মানুষ সিনিয়রদের সম্মান তো করবেই- তাদের সামনে একেবারে মাথা নত করে থাকবে। তাই এ সমাজের মানুষের অন্যের পেশাদার জীবনের থেকে তাদের ব্যক্তিগত জীবনেই মানুষের বেশি আগ্রহ। তারকারাও এর ব্যতিক্রম নয়।

জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র

সাকিব আল হাসান কিংবা ভিরাট কোহলি, মাঠের পারফর্ম্যান্স থেকে মাঠের আচরণ কিংবা মাঠের বাইরের জীবন নিয়েই সাধারণ মানুষের যত আগ্রহ। বিশ্ব ফুটবলেও খেলোয়াড়দের বাইরের জীবন নিয়েই মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। তবে একজন আছেন যার মাঠের বাইরের উদ্ধত কথা মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জায়গায় উল্টো আনন্দ দেয়। তিনি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।

ফুটবল ক্যারিয়ারে মাত্র এক মৌসুম বার্সেলোনায় খেলেছেন। এরপর ধারে চলে গেছেন এসি মিলানে, ঐ একমাত্র মৌসুমে ইব্রা ছিলেন না ছন্দে। কোচ পেপ গার্দিওলার সঙ্গেও ছিল দহরম-মহরম সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক নিয়ে ইব্রা যা বলেছিলেন তাতে খুব বেরসিক মানুষও না হেসে পারবে না।
“আমাকে কেনা মানে ফেরারি কেনা, ফেরারি চালাতে ট্যাঙ্কে প্রিমিয়াম পেট্রোল ভরতে হবে, গার্দিওলা ট্যাংকে ডিজেল ভরে এদিক ওদিক চক্কর দিল। ওর আসলে একটা ফিয়াট কেনা উচিত ছিল”

জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র

২০১২ সালে নাম লেখালেন ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ে। নতুন ক্লাব, নতুন শহর। নতুন শহরে বাসা খোঁজা কত কষ্ট ঢাকা শহরের ব্যাচেলরদের নতুন করে আর বলে দিতে হবে না। তবে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার দিন ইব্রা বললেন বাসা খুঁজে না পেলে তিনি কিনে ফেলবেন একটা গোটা হোটেল।

“আমি একটা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজছি। খুঁজে না পেলে আমি হয়তো গোটা একটা হোটেলই কিনে ফেলব।”

লিগ ওয়ানকে তো সমালোচকরা বলেন কৃষক লিগ, ইব্রারও সেটা অজানা থাকার কথা নয়। ফরাসি লিগের খেলোয়াড়দের যে তিনি চেনেন না তা অকপটে স্বীকার করার পাশাপাশি নিজের বন্দনা করতেও ভোলেননি, ওটাই যে সবচেয়ে বেশি ভালো পারেন।

“এটা সত্যি যে এখানকার খেলোয়াড়দের সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। তবে আমি কে, এটা নিশ্চয়ই ওদের জানা আছে।”

ক্লাব ফুটবল কিংবদন্তি ওয়েন রুনি, ফিনিশার হিসেবে ছিল খুব নামডাক। পিএসজিতে থাকাকালীন সেই রুনিকে একেবারে গোনায়ই ধরেননি ইব্রা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেদ ছেড়ে তাকে পিএসজিতে আসতে বলেছিলেন কেন জানেন? নিজের শক্তি দেখাতে!

“ওয়েইন রুনি যদি দল বদলাতে চায়, তাহলে আমি তাকে প্যারিসে আসতে বলব। কেননা এখানে যোগ দিলে আমি যে ওর চেয়ে ভালো গোল করতে পারি, ও অভ্যস্ত হয়ে যেত।”

পিএসজিতে শেষের সময়টা ইব্রার ভালো যায়নি। মূলত কোনো ক্লাবেই শেষের সময়টা তার ভাল যায় না। পিএসজি ছাড়ার আগে বলেছিলেন আইফেল টাওয়ারের জায়গায় তার মূর্তি বসাতে পারলেই কেবল থেকে যাবেন!

“আমার মনে হয় না তারা আইফেল টাওয়ার সরিয়ে সেখানে আমার মূর্তি বসাবে, এমনকি ক্লাব ম্যানেজমেন্ট বদলে ফেলতে পারবে বলেও বিশ্বাস করি না। এগুলো করতে পারলেই বরং আমি এখানে থেকে যেতে পারি।”

শেষমেশ ক্লাব ছাড়তে হলো ইব্রাকে, সুইডিশ স্ট্রাইকার যাওয়ার সময়ও নিজের গুণগান করা থামাননি।

“রাজার মতো এখানে এসেছিলাম, কিংবদন্তি হয়ে বিদায় নিচ্ছি।”

পেপ গার্দিওলাকে দিয়ে শুরু করেছিলাম, আবার সেই গার্দিওলার সঙ্গে ইব্রা। এই স্প্যানিশ কোচ ছিলেন ইব্রার চক্ষুশূল! একদম সহ্যই করতে পারতেন না, পেপ নাকি তার সামনে দার্শনিক সাঁজার চেষ্টা করতেন।

“প্রায়শই গার্দিওলা তার দার্শনিক কথাবার্তা শুরু করে দিত। আমি তা শুনতাম না বললেই চলে। কেন শুনব? ওসব তো ছিল রক্ত, ঘাম আর চোখের জল জাতীয় কথাবার্তার বাড়তি একটু রূপ।”

গার্দিওলাকে যে একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না সেটার প্রমাণ তার আরেকটা উক্তিতেই পাওয়া যায়। যেখানে তিনি টেনেছেন জোসে মরিনিওকে।

“জোসে মরিনিও গার্দিওলার একেবারে উল্টো। মরিনিও যদি ঘর আলোকিত করা মানুষ হন, তাহলে গার্দিওলা হলেন পর্দা টেনে ঘরে আলো ঢুকতে না দেওয়া সেই লোক। আমার অনুমান, তার সঙ্গে তুলনা করতে গার্দিওলা।”

জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মুখই যার অস্ত্র

শুধুই গার্দিওলা নয়, ইব্রা খোঁচা মারতে ছাড়েননি ডেভিড বেকহামকেও। এই ইংলিশ তারকার রুচিশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় সবখানে, সেই বেকহামের রুচি নিয়ে খোঁচা মারতেও ছাড়েননি ইব্রা।

“ড্রেসিংরুমে আমরা বেকহামের প্লে-লিস্ট দেখছিলাম। সেখানে দেখলাম ও জাস্টিন বিবার, জোনাস ব্রাদার্স ও সেলিনা গোমেজদের গান শোনে। ডেভিড বেকহামেরও যে সব রুচি ভালো নয়, তা জানতে পেরে ভালোই লাগে।”

২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন ইব্রা, সাংবাদিক কী আটকাবেন-ইব্রা নিজেই আটকে দিয়েছিলেন তাকে।

“বিশ্বকাপে কে কোয়ালিফাই করবে তা একমাত্র ইশ্বর বলতে পারবেন, আর আপনি তার সঙ্গেই কথা বলছেন।”

পর্তুগালের কাছে হেরে শেষ পর্যন্ত সুইডেন কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়, তাতেও থামেননি ইব্রা। উল্টো বিশ্বকাপকেই বয়কট করেন।

“যে বিশ্বকাপে ইব্রা থাকবে না, সেই বিশ্বকাপে আসলে দেখার কিছু নেই। সুতরাং বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা করার কোনো মানেই হয় না।”

পরের বৈশ্বিক আসর, অর্থাৎ ইউরো-২০১৬ তেও সুইডেনের বাদ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। উল্টো ইব্রার জোড়া গোলে ডেনমার্ককে বিদায় করে মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে সুইডেন। সমালোচকরা কি এবার আর পার পেয়ে যান? তখনও পাননি!

“তারা ভেবেছিল আমাকে এভাবেই অবসরে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। আফসোস, বলে ভাবা আমি তাদের গোটা দেশকেই অবসরে পাঠিয়ে দিলাম।”

ইব্রা পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই এভাবে নিজের গুণগান করেছেন। কখনো নিজেকে প্লেস্টেশনের ফুটবলারদের গুরু বলেছেন, কখনো নিজের স্টাইলের গুণকীর্তন করেছেন। দিনশেষে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ মানেই উদ্ধত আচরণের সম্রাট।

[ জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন