ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি

ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি : অবসর সময়টাকে রাঙিয়ে তুলতে কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডার ছলে ক্যারাম খেলার দৃশ্য বাংলাদেশে অনেক সময়ই দেখা যায়। ক্যারাম মানসিক অবসাদ কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।ক্যারাম বোর্ড খেলা মূলত এক প্রকারের টেবিলটপ খেলা। ক্যারাম খেলার সঙ্গে অনেক কৌশলগত সাদৃশ্য  পরিলক্ষিত হয় বিলিয়ার্ডস ও টেবিল শাফলবোর্ড খেলার।এ খেলায় হাতের আঙ্গুল অধিক ব্যবহার হয় একারণে এই খেলার অপর নাম ফিঙ্গার বিলিয়ার্ডস।

[ ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি ]

ক্যারাম খেলা আবিষ্কার হয় মূলত দক্ষিণ এশিয়ায়। অনেকের মতে শ্রীলংকায় খেলাটা প্রথম শুরু হয়।ভারতীয়দের বিশ্বাস যে তাদের দেশের অধিবাসিরাই শ্রীলংকায় খেলাটা ছড়িয়ে দেয় ।আবার অনেকে মতে পর্তুগালে আবিষ্কার হওয়ার পর ক্যারাম খেলা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সালের দিকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ক্যারাম খেলা হতো। অবশ্য বিলিয়ার্ডের খেলার মতো এদের ক্যারাম খেলার নিয়মটা ছিল।ঐ সময়ের ক্যারাম বোর্ডে ছয়টি পকেট ছিল। আমেরিকায় ১৮৯০  সালে ক্যারাম খেলার নিয়মে পরিবর্তন এনেছিলেন শিক্ষক হেনরি হাস্কেল।

তিনি স্ট্রাইকারের ওজন কমান এবং গুটিগুলো আকৃতি পরিবর্তন করে রিংয়ের মত করেন। যেই আকৃতিতে বর্তমানে ক্যারাম খেলার হয়ে থাকে।আন্তর্জাতিক ক্যারাম ফেডারেশন (আইসিএফ) ভারতের চেন্নাইতে ১৯৮৮ সালে গঠিত হয়।এরপর থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করা শুরু হয়।১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রথম ক্যারাম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বাংলাদেশ ক্যারাম ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৯০ সালে।

ক্যারাম বোর্ডের উপরিভাগ প্লাইউডের বা অন্য কোন কাঠের তৈরি হবে। এই প্লাইউড বা কাঠ হতে হবে সমতল ও খুবই মসৃন এবং কমপক্ষে ৮ মিলিমিটার পুরু। এাঁ বর্গাকার এবং প্রতিবাহুর দৈর্ঘ্য সর্বনিম্ন ৭৩.৫০ সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ ৭৪ সেন্টিমিটার হবে। এর উপরিভাগ এতই মসৃণ যে, ১৫ গ্রাম ওজন বিশিষ্ট একটি স্ট্রাইকার দিয়ে উল্টো দিকের কাঠের ফ্রেমে অত্যন্ত জোরে আঘাত করলে ’স্টাইকার দিয়ে উল্টো দিকের কাঠের ফ্রেমে অত্যন্ত জোরে আঘাত করলে ’স্ট্রাইকার কমপক্ষে ৩ ১/২ বার এপার ওপার আসা যাওয়া করবে।

ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি
একটি ক্যারামের বোর্ড

বোর্ডের উপরিভাগের চারদিক রোজউড বা অন্য কোন শক্ত কাঠ দ্বারা আটকে দিতে হবে। এই কাঠ হবে ’সিনজড’ অর্থাৎ ঠান্ডা বা গরমে যেন ফেটে বা বেঁকে না যায়। কাঠের ফ্রেম ৬.৩৫ সেন্টিমিটারের কম বা ৭.৬০ সেন্টিমিটারের বেশি চওড়া হবে না এবং এর চার কোনা বাঁকা হবে। বোর্ডের উপরিভাগ থেকে ফ্রেমের উচ্চতা সর্বনি¤œ ১.৯০ সেন্টিমিটার এবং ২.৫৪ সেন্টিমিটারের মধ্যে হবে। বোর্ডেও উপরিভাগ সমতল রাখার জন্য এর নিচে ক্ষুদ্রাকার চৌ-কোণা ফ্রেম সংযুক্ত করতে হবে।

বোর্ডেও চার কোণায় ৪টি গোলাকার ’পকেট’ থাকবে। প্রতিটি পকেটের ব্যাস হবে ৪.৪৫ সেন্টিমিটার। পকেটের ব্যাস বড় জোর ০.১৫ সেন্টিমিটার। পকেটের ব্যাস বড় জোর ০.১৫ সেন্টিমিটার বড় করা যেতে পারে। বোর্ডেও চার কোণায় ফ্রেইমের সাথে সংযুক্ত প্রইাউড কেটে এই পকেট তৈরি করতে হবে।

ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি
ক্যারাম খেলার স্ট্রাইকার

বোর্ডের প্রত্যেক পার্শ্বের ফ্রেমের সাথে সমান্তরাল করে বোর্ডের উপরিভাগে ৪৭ সেন্টিমিটার দীর্ঘ কালো রং এর দুটি করে সরল রেখা টানা হবে। এই দুটি রেখার বা লাইনের নিচেরটি ০.৫০ সেন্টিমিটার থেকে ০.৬৫ সেন্টিমিটার চওড়া হবে এবং ফ্রেম থেকে ১০.১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে থাকবে। বেইস লাইনের নিচ থেকে অপর সরু লাইন পর্যন্ত মাঝখানের দূরত্ব হবে ৩.১৮ সেন্টিমিটার।

’বেইস লাইনের’ উভয় প্রান্তে একটি করে বৃত্ত আঁকা হবে। এই বৃত্তের ব্যাস হবে ৩.১৮ সেন্টিমিটার। এই বৃত্তের মধ্যে ২.৫৪ সেন্টিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট জায়গাটি লাল রং এর হবে। এই বৃত্ত বা সার্কেল গুলোকে ’বেইস সার্কেল’ বলে। এই বৃত্ত এমনভাবে আঁকতে হবে যাতে বেইস লাইনের উভয় প্রান্তকে স্পর্শ করে। তাছাড়া এক পাশের ’বেইস সার্কেল’ থেকে অপর পার্শ্বেও ’বেইস সার্কেলের’ মাঝখানের দূরত্ব হবে ১.২৭ সেন্টিমিটার।

ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি
ক্যারাম বোর্ডের পকেট

 ০.১৫ সেন্টিমিটার চওড়া কাল রং এর চারটি তীর ক্যারাম বোর্ডের প্রতি কোণে পকেটের মাঝ বরাবর নিশান করে আঁকতে হবে। এই তীর দু’দিকের দু’টি বেইস সার্কেলের মাঝখানের খালি জায়গার মধ্য দিয়ে পার হয়ে যাবে এবং পকেট থেকে ৫.০০ সেন্টিমিটার দূরে থাকবে। প্রতিটি তীরের দৈর্ঘ্য ২৬.৭০ সেন্টিমিটারের বেশি হবে না। তীরের পিছন ভাগে ৬.৩৫ সেন্টিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট একটি করে সুন্দর অর্ধবৃত্ত থাকতে পারে।

বোর্ডের উপরিভাগের কেন্দ্র বিন্দুতে ৩.১৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের কাল রেখা বিশিষ্ট একটি বৃত্ত থাকবে। এই বৃত্তটি লাল রং দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। একে ’সেন্টার সার্কেল’ বলে।

ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি
ক্যারামে খেলার গুটি

বোর্ডেও কেন্দ্র বিন্দু থেকে ১৭.০০ সেন্টিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট আরেকটি বৃত্ত থাকবে। একে ’আউটার সার্কেল’ বলে। এই আউটার সার্কেল বিভিন্ন নকশা দ্বারা চিত্রিত করা যেতে পারে।

ক্যারাম খেলার ঘুঁটি ভাল মানের কাঠের তৈরি ও গোলাকার হবে। ঘুঁটির ব্যাস ৩.১৮ সেন্টিমিটারের বেশি কিংবা ৩.০২ সেন্টিমিটারের কম হবে না এবং পুরু হতে হবে ০.৭০ সেন্টিমিটার থেকে ০.৯০ সেন্টিমিটারের মধ্যে। ঘুঁটির প্রান্ত হবে গোলাকার এবং মসৃণ। প্রতিটি ঘুঁটির ওজন ৫.০০ গ্রামের নিচে অথবা ৫.৫০ গ্রামের উপরে হবে না।

ক্যারাম খেলার ঘুঁটি হবে ৯টি সাদা, ৯টি কাল এবং ১ টি লাল রং এর যাকে রেড বলে। প্রত্যেকটি ঘুঁটি আকাওে আয়তনে ও ওজনে একই রূপ হবে। ষ্ট্রাইকার দিয়ে বোর্ডে উপরে ঘুঁটিতে আঘাত করলে ঘুঁটিগুলি সাবলিল গতিতে চলতে হবে।

ক্যারাম খেলার ষ্ট্রইকার হবে গোলাকার ও মসৃণ এবং ব্যাস ৪,১৩ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৫ গ্রামের বেশি হবে না। ধাতব পদার্থ ছাড়া অন্য যে কোন পদার্থ দিয়ে ষ্ট্রাইকার তৈরি হতে পারে। সুদৃশ্য নকশা কাটা ষ্ট্রাইকারও ব্যবহৃত হতে পারে তবে তা উপরের বর্ণনা অনযায়ী তৈরি হতে হবে।

যে টেবিল বা ষ্ট্যান্ডের উপর বোর্ড রেখে ক্যারাম খেলা হবে তা উচ্চতায় ৬৩.০০ সেন্টিমিটারের কম এবং ৭০ সেন্টিমিটারের বেশি হবে না। ষ্ট্যান্ডের উপর বোর্ড বসানোর পর বোর্ডেও কোন পার্শ্ব বা নিচু এবং নড়াচড়া করবে না। ষ্ট্যান্ডের উপর বোর্ডটি স্থিরভাবে স্থাপন করতে হবে।

যে টুল বা চেয়ারের উপর বসে খেলোয়াড় ক্যারাম খেলবে তার উচ্চতা ৪০.০০ সেন্টিমিটারের কম এবং ০ সেন্টিমিটারের বেশি হবে না। তবে হাতল ছাড়া চেয়ার ব্যবহার করতে হবে।

ক্যারাম খেলার জন্য উন্নতমানের পাউডার ব্যবহার করতে হবে যাতে বোর্ডের উপরিভাগ মসৃণ ও শুকনো থাকে। কৌঁটা থেকে পাউডার ব্যবহার করলে তা বোর্ডে সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।

ক্যারাম বোর্ডে প্রত্যেক পকেটের নিচে নেট লাগিয়ে নিতে হবে যাতে ঘুঁটি পকেটে পড়লে নেটে গিয়ে জমা হতে পারে। ১০ টি ঘুঁটির জায়গা হয় এমন বড় নেট লাগাতে হবে।

ক্যারাম বোর্ডের উপর সুবিধাজনক আলোর জন্য বাল্বের ক্ষমতা ৬০ অথবা ১০০ ওয়াটের হতে পারে। তবে আলো যেন কোনভাবেই খেলোয়াড়ের চোখে না লাগে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

“ক্যারাম খেলার ইতিহাস এবং নিয়মাবলি”-এ 25-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন