জলাতান “দ্য কিং”

জলাতান “দ্য কিং” : জলাতান ইব্রাহিমোভিচ, সুইডিশ ফুটবল তারকা। নিজের দিনে একক নৈপুণ্যে নিজ দলকে জয় এনে দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে জলাতানের। এই ৪২ বছর বয়সেও ফুটবল পীচে নিজের পায়ের কারিশমা দেখিয়ে চলেছেন জলাতান। বয়সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জলাতান এখনো এগিয়ে চলেছেন আপন গতিতে।

রোজেনগার্ড, মালমো শহরে অবস্থিত একটি সাধারণ স্থান। অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও বেকারত্তের আগ্রাসনে আহত সুইডেনের এই শহরে ১৯৮১ সালের ৩ অক্টোবর জন্ম নেন দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলার,জলাতান ইব্রাহিমোভিচ।

জলাতান ইব্রাহিমোভিচ এর বড় হয়ে ওঠা এমন এক জায়গায় যেখানে পেশিশক্তি না দেখিয়ে টিকে থাকা কঠিন ছিল। স্থানীয় মানুষজন ও উঠতি বয়সী ছেলেরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখত আগ্রাসি মনোভাব আর দেমাগের আশ্রয় নিয়ে। তাই ইব্রাহিমোভিচের জীবনের প্রথম শিক্ষা ছিল,”বেঁচে থাকতে হলে কঠোর হতেই হবে”।

জলাতান "দ্য কিং"
জুভেন্টাসের জার্সি গায়ে ইব্রাহিমোভিচ

[ জলাতান “দ্য কিং” ]

তাঁর মা তাকে শাসন করতেন লম্বা কাঠের চামচ দিয়ে, সেটা ভেঙ্গে গেলে আরেকটা নিয়ে আসতেন। তবে শাসন থাকলেও, মায়ের কাছ থেকে ভালবাসা কম পান নি। তাঁর বাবা ছিলেন মদ্যপায়ী, ছেলেকে আর পরিবার কে অত সময় দিতেন না। ইব্রাহিমোভিচ ওই বয়সে ফুটবল ট্রেনিং করতেন মালমো ফুটবল ফেডারেশনে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অন্য মানুষের সাইকেল চুরি করে ট্রেনিং এ যেতেন ইব্রা।

১৯৯৯ সালের কথা, ১৫ বছর বয়সে মালমোর মেইন টিমে জায়গা করে নেন। সেই সময়ে তাঁর আইডল ছিলেন গ্রেট ব্রাজিলিয়ান রোনালদো। ২০০১ সালে আর্সেনাল তাঁর ট্রায়াল নিতে চাইলে তাঁর উক্তি ছিল,”জলাতান কখনো অডিশন দেয় না”।

আর্সেনালের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে, তখন তিনি সরাসরি আয়াক্সে যোগ দেন এবং ২০০৪ সাল পর্যন্ত সেখানে থাকেন। জীবনের প্রথম বেতন দিয়ে গাড়ি কিনবার পরে তাঁর হুশ হয় তাঁর খাবার কেনার টাকা নাই। পরবর্তীতে ব্রাজিলিয়ান প্লেয়ার ম্যাক্সঅওেল তাঁর কিছুদিন ভরণপোষণ করেন।

আয়াক্স এর সাথে ২ টা লিগ টাইটেল জেতার পরে চলে যান জুভেন্টাসে,২০০৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত থাকেন সেখানে। ২ বছরে ২ টা লিগ জিতলেও ম্যাচ ফিক্সিং এর জন্য জুভেন্টাসের লিগ টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। জুভেন্টাস চলে যায় সিরি আ থেকে নেমে সিরি বি তে। ইব্রাহিমোভিচ তখন ট্রান্সফার হয়ে যান ইন্টার মিলানে, দুনিয়া তখন আস্তে আস্তে চিনতে শুরু করেছে এই বিগ সুইডিশ কে।

কোন এক সিজনে ইন্টার মিলানের শেষ ম্যাচ ছিল পারমার সাথে, লিগ জিততে হলে তাদের শেষ ম্যাচ জেতাই লাগত, ইব্রা ছিলেন ইনজুরিতে। কোনভাবেই কিছু করতে পারছিল না ইন্টার, শেষ মেশ ইনজুরি নিয়েই নেমে যান দ্বিতীয়ও হাফে এবং নেমে ২ গোল করে ইন্টার কে শিরোপা জেতান।

জলাতান "দ্য কিং"
মেসি এবং ইব্রাহিমোভিচ

২০০৯ সালে পাড়ি জমান বার্সেলোনায় ৫৯ মিলিওন পাউন্ডের বিনিময়ে। তবে এই ট্রান্সফারটা সুখকর ছিল না। লা লিগা জিতেন সেখান এবং ২১ গোল ও করেন বার্সার হয়ে। কিন্তু দ্বন্দ্ব লেগে যায় তৎকালীন বার্সা কোচ পেপ গারদিওলার সাথে। ইব্রার মতে, বার্সার লা মাসিয়া থেকে গ্রাজুয়েট প্লেয়াররা হল “স্কুল ছাত্র” কেননা তারা ওইটাই করে তাদের যা বলা হয়। আর পেপ গারদিওলা তাকে প্রপার রোল এ নামাতেন না তাঁর ট্যাকটিস এর কারনে, তাই পেপ এর সাথেও তাঁর সম্পর্ক তেমন ভাল ছিল না। পেপ সম্পর্কে তাঁর একটা উক্তি ছিল এরকম,”সে ফেরারি কিনে সেটাকে ফিয়াট এর মত চালায়”।

মাত্র ১ বছর বার্সায় থেকে আবার ফেরত আসেন ইতালিতে, যোগ দেন এসি মিলানে। এসি মিলানে এসেই আবার সিরি আ জিতেন। ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ছিলেন সেখানে। এই পর্যন্ত তিনি ৮ বছরে বিভিন্ন দলের হয়ে সব জায়গায় প্রতিবার লিগ টাইটেল জিতেছেন, রেকর্ড বটে।

ফ্রেঞ্চ লিগের দল পিএসজি তে চলে যান ২০১২ সালে। তিনি জীবনে যতবার দল বদলেছেন, তাতে মোট ট্রান্সফার ফি লাগে ১৮০ মিলিওন ইউরো! যা ফুটবল বিশ্বের যেকোনো প্লেয়ারের তুলনায় সেটা বেশি। ৪ বছর পিএসজি তে থেকে সেখানেও ৪ টা লিগ জিতেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এত লিগ জিতেও তিনি এখনও একটিও চ্যাম্পিওন্স লিগ জিততে পারেন নি। এই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের সবচাইতে আকর্ষণীও গোলগুলোর ভেতর একটি তাঁর করা, সেই বিখ্যাত ৪০ মিটার দূর থেকে বাইসাইকেল কিকের গোলটি এখনও ফুটবল অনুরাগীদের চোখে ভাসার কথা।

জলাতান "দ্য কিং"
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি গায়ে ইব্রাহিমোভিচ

২০১৬ সালে ফ্রি ট্র্যান্সফারে তিনি যোগ দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে, বয়স ৩৫ হয়ে গেছে ততদিনে, অনেকে বলতে থাকলেন এই বয়সে প্রিমিয়ার লিগের মত জায়গায় কিছুই করতে পারবেন না। কিন্তু বয়স কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ইউনাইটেডের হয়ে পুরা সিজনে ২৮ গোল করে দেখিয়েছেন। প্রিমিয়ার লিগ জিতাতে পারেন নি দল কে, কিন্তু ইউনাইটেডের দুঃসময়ে জিতিয়েছেন লিগ কাপ ও ইউরোপা লিগ।

২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসর নেন ইব্রাহিমোভিচ। সে বছর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় সুইডেন। অধিনায়ক হিসেবে দলকে পথ দেখাতে না পেরে সরে দাঁড়ান তিনি। তবে ক্লাব ফুটবলে তার দাপট ঠিকই দেখছিল ফুটবল দুনিয়া।

জলাতান "দ্য কিং"
এসি মিলানের হয়ে শিরোপা জেতার পর ইব্রাহিমোভিচ

তবে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তার দল সুইডেন কোয়ালিফাই করতে পারেনি। কিন্তু, এসি মিলানের হয়ে নিজের কথা ঠিকই রেখেছেন জিতেছেন এসি মিলানের ২০২১-২২ মৌসুমের সিরি ‘আ’ ট্রফি।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন