তামিম ইকবাল : প্রারম্ভিকার এক ভরসাময় স্তম্ভ

তামিম ইকবাল : প্রারম্ভিকার এক ভরসাময় স্তম্ভ : বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ওপেনার কিংবা সর্বকালের অন্যতম সেরা বাংলাদেশী ক্রিকেটারের নাম বললেই সবার আগেই চলে আসবে তামিম ইকবালের নাম। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নিজের অভিষেক ম্যাচ স্মরনীয় করে না রাখতে পারলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের বিপক্ষে ২০০৭ ওয়ার্ল্ডকাপের প্রথম ম্যাচে নিজের আগমনী বার্তা ঠিকই দিয়েছিলেন তামিম। সেদিন জহির খান, মুনাফ প্যাটেল, হরভজন সিংহের মতো অভিজ্ঞ বোলারদের তুলোধুনো করে ছেড়েছিলেন ১৭ বছর বয়সী তামিম।

তামিম ইকবাল
্ভারতের বিপক্ষে ২০০৭ বিশ্বকাপে তামিম

তামিমের সেই ৫৩ বলে ৫১ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংস যুগ যুগ ধরে মনে রাখবেন বাংলাদেশী ক্রিকেট প্রেমীরা। সেদিনই ছিলো শুরু, এরপর সময়ের পরিক্রমায় তামিম নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। তামিমের সেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং একটা সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রেমীদের চোখের মণি হয়ে উঠেছিল। তামিমের ব্যাটিং নৈপুণ্যে বাংলাদেশ বেশ কিছু ম্যাচ জিতেছে।

[ তামিম ইকবাল : প্রারম্ভিকার এক ভরসাময় স্তম্ভ ]

 ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩ ম্যাচ সিরিজের শেষ ম্যাচে তামিমের অনবদ্য ৬৩ রানের ইনিংস শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা গড়ে তুললেও একটুর জন্য ম্যাচটি বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যায়। ২০০৭ এ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট এবং ওয়ানডে উভয় সিরিজেই একটি করে ফিফটি করেন তামিম। পরের বছর ,ঘরের মাটিতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম  সেঞ্চুরি করেন তামিম ইকবাল। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং পাকিস্তানের বিপক্ষেও ফিফটি করেন তিনি।

তামিম ইকবাল
লর্ডসে সেঞ্চুরির পর তামিমের উদযাপন
২০০৯ সালেও তামিম বরাবরের মতোই নিজের ব্যাটিংকে আরো উন্নত থেকে উন্নততর করে তোলেন।  জিম্ববাবুয়ের  বিপক্ষে একটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজে তার ম্যাচ বাচানো ১৫৪ এর ঝলমলে ইনিংস এখনো দর্শক হৃদয়ে গেথে আছে।
২০১০ সাল ছিলো তামিম ইকবালের আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের  সবচেয়ে স্বর্ণালি এবং স্মরণীয় এক বছর। সে বছর টেস্টে ঘরের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে ১৫১ রানের এক ঝলমলে ইনিংস খেলেন তামিম। আবারো ঘরের  মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরিসহ, ইংল্যান্ডের মাটিতে  তাদের  বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে  সিমিং কন্ডিশনে ২টি সেঞ্চুরি করেন তামিম। যার ফলে লর্ডসে অনার্স বোর্ডে নাম লিখান তামিম। পরবর্তীতে উইজডেনের বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটার নির্বাচিত হন তামিম।
তবে ২০১১ সাল তামিমের জন্য ঠিক তেমন সুখকর ছিলো না। সে বছর টেস্ট এবং ওয়ানডে ক্রিকেট মিলিয়ে কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি তামিম। হাফ সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিলেন  মাত্র ৪টি । ২০১২ এর শুরুতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত  বিপিএলের প্রথম আসরেও তিনি ব্যাট হাতে ছিলেন ম্লান। যার ফলে ২০১২ এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দলে তার  খেলা নিয়ে দেখা দেয় শঙ্কা। তবে অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ দলে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচকরা।
তামিম ইকবাল
এশিয়া কাপ ২০১২ তে টানা ৪ ফিফটি করার পর তামিম ইকবাল
ঘরের মাটিতে সে বছর  এশিয়া কাপে টানা ৪ ম্যাচে ৪ টি ফিফটি করেন ।যার ফলে , সেবারই প্রথম   এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালের শুরুতেও শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজে  সেঞ্চুরি করেন তামিম। তবে , ইঞ্জুরির কারণে সে সিরিজের বাকি ম্যাচ গুলো খেলতে পারেননি তামিম।
২০১৪ থেকে ২০১৫ ওয়ার্ল্ড কাপের আগ পর্যন্ত নিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময় পার করেছেন তামিম। তবে ,২০১৫ ওয়ার্ল্ড কাপের পর ঘরের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম দুই ওয়ানডেতে টানা দুই সেঞ্চুরি এবং সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে এক  ফিফটির কারণে সে বছর পাকিস্তান দলকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ দল। সে সিরিজের ম্যান অব দ্যা সিরিজ নির্বাচিত হন।

এরপর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর রানের খরায় দেখা যায়নি বাংলাদেশের বর্তমান এই ওয়ানডে অধিনায়কের ব্যাটে। আন্তর্জাতিক  টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের একমাত্র সেঞ্চুরিয়ানও তিনি। তবে, ক্রিকেটের সব ফরমেটে ব্যাটে রানের ফোয়ারা থাকা সত্ত্বেও সমালোচনা এখনো হাত ছাড়েনি তামিমের। পূর্বে তামিম অনেকটা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করলেও বর্তমানে তিনি দলের হয়ে ইনিংস বড় করে দলকে একটি বড় স্কোরের পথে পরিচালিত করার পক্ষে অধিক মনোযোগী।

তামিম ইকবাল
পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর তামিম
গেলো বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারের কথা জানান তামিম ইকবাল।  তামিমের বিশ্বকাপ দল থেকে নাম প্রত্যাহারের ঘোষণার কারণ হিসেবে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের তার সঙ্গে দ্বন্দের কথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে ক্রিকেট পাড়ায়।
প্রায় ২২ মাস টি টোয়েন্টি দলের বাহিরে তামিম। তামিম ছাড়া ওপেনিং স্লটে মোট ৭ জন ব্যাটার খেলেছে বাংলাদেশ দলে। কিন্তু, এই ২২ মাসে কোনো ব্যাটারই তামিমের ক্যারিয়ার টি টোয়েন্টি স্ট্রাইক রেট থেকে বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে পারেননি। পুরো আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে তামিম ইকবালের স্ট্রাইক রেট ১১৭.২ ।
নাইম শেখ , লিটন দাস, সৌম্য সরকার  , মেহেদী হাসান, , নাজমুল হাসান শান্ত , সাইফ হাসান এমনকি  সাকিব আল হাসানও ওপেন করেছেন। কিন্তু, কেউই তামিমের ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেট স্পর্শ করতে পারেননি।
10 1 তামিম ইকবাল : প্রারম্ভিকার এক ভরসাময় স্তম্ভ

বলা হয়ে থাকে, যে সমালোচনার যোগ্য তারই সমালোচনা হয়ে থাকে। তাইতো, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের এক অন্যতম ভরসার নাম হয়েও এতো সমালোচনা তাকে নিয়ে।সমালোচনা তামিমের জন্য  নতুন কিছু নয় । যতবারই সমালোচকরা সমালোচনায় মেতে  উঠেছে , ঠিক ততোবারই তামিম  জবাব দিয়েছেন ব্যাট দিয়ে।

তামিম ইকবাল
বিপিএল ২০২২এ সেঞ্চুরির পর তামিম ইকবাল
এবারের, বিপিএলেও ব্যাট হাতে জবাব দিচ্ছেন তামিম। এখন পর্যন্ত বিপিএলের এবারের আসরে তিনি ২টি ফিফটি এবং ১টি সেঞ্চুরি হাকিয়েছেন। তার সেঞ্চুরি করা ইনিংসটিতে তিনি ১৭৩.৪৩ স্ট্রাইক রেটে ৬৪ বলে অপরাজিত ১১১ রান করেছেন।

সম্প্রতি, টি টোয়েন্টি ক্রিকেট  থেকে ৬ মাস বিরতিতে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন তামিম। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ দলে কোনো ভালো টি টোয়েন্টি ওপেনার উঠে না আসলে, আবারো জাতীয় দলে ফেরার কথা বলেছেন তিনি। তামিম ফিরবেন, আবারো গায়ে জড়াবেন বাংলাদেশ টি টোয়েন্টি জার্সি এটাই  যেনো প্রত্যাশা তার ভক্তকুলের।

 

“তামিম ইকবাল : প্রারম্ভিকার এক ভরসাময় স্তম্ভ”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন