দল থেকে বাদ পড়ার উদ্ভট কাহিনী

দল থেকে বাদ পড়ার উদ্ভট কাহিনী : খবরের পাতায় চোখ রাখলে কিংবা টিভিসেটে উঁকি মারলে দল থেকে বাদ পড়ার কত কত ঘটনাই তো শোনা যায়, দেখা যায় নিয়মিত। যেকোনো খেলার সঙ্গেই বাদ পড়া একেবারে সাধারন একটা ঘটনা। ক্রিকেটপ্রেমী জাতি হওয়ায় ক্রিকেটের বাদ পড়ার ঘটনাই আমাদের বেশি টানে। কারো কারো দল থেকে বাদ পড়া আমাদের আনন্দে ভাসায়, কারো বাদ পড়া আমাদের ভাবায়-কাঁদায়।

পারফর্ম্যান্স এবং ইনজুরি ছাড়াও নানা কারণে ক্রিকেটাররা দল থেকে ছিটকে যান। শৃংখলাজনিত কারণে দল থেকে বাদ পড়ার ঘটনা একেবারেই নিয়মিত, এছাড়া কোচ-খেলোয়াড়ের দ্বন্দ্বের বলি হয়েও অনেকে দল থেকে বাদ পড়েন। করোনা বাস্তবতায় এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বায়োবাবল ভাঙ্গা!

দল থেকে বাদ
নিরোশান ডিকওয়েলা, কুশল মেন্ডিস,গুনাথিলাকা

বায়োবাবল ভাঙ্গায় অনেক ক্রিকেটার বাদ পড়ছেন, অনেকে আবার নিষিদ্ধ হচ্ছেন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ নিরোশান ডিকওয়েলা, কুশল মেন্ডিসসহ তিন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার। ক্রিকেট ইতিহাসে দল থেকে বাদ পড়ার এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেটা দেখলে বা শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।

অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক কিংবা ক্রিকেট ইতিহাসবিদদের মতে ঘরোয়া ক্রিকেটের আবেদন কিংবা জৌলুস অনেকাংশেই এখন কমে এসেছে। আগে ক্রিকেটাররা নিজেদের রাজ্য দল কিংবা ঘরোয়া দলের গর্বের জন্য, সম্মান রক্ষার্থে ক্রিকেট খেলত।

যেকোনো মূল্যে জয় পেতে চাইতো, তাই বলে বলছি না যে এখন চায় না! তবে আগের স্পিরিটের সঙ্গে এখনের স্পিরিটের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আঠার-উনিশ শতকে খেলোয়াড়দের এমন স্পৃহা ছিল। এমনকি রাজ্য দলে খেলানোর জন্য জাতীয় দল থেকে এক ক্রিকেটারকে কিডন্যাপ করার ঘটনাও আছে ক্রিকেটে। কিডন্যাপারের নাম উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস। যাকে ক্রিকেট ঐতিহাসিকরা ‘ক্রিকেটের পিতামহ’ বলেই জানেন। আর যাকে কিডন্যাপ করেছিলেন তিনি বিলি মিডউইন্টার।

১৯৫১ সালের ১৯ জুন গ্লস্টারশায়ারে জন্ম মিডউইন্টারের। ৯ বছর বয়সে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ায়, ওখানেই প্রথম ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম দুই ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে মাঠে নামেন তিনি।

এরপর ডব্লিউ জি গ্রেসের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে যোগ দেন তার নিজের শহর গ্লস্টারশায়ারের ক্লাব গ্লস্টারশায়ারে। এখন যে এত এত বিদেশি ক্রিকেটার কাউন্টি খেলছেন, তার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন এই মিডউইন্টার। কেননা তিনিই ইতিহাসের প্রথম বিদেশি ক্রিকেটার হিসেবে কাউন্টিতে খেলেন।

সেই মৌসুমে ৯ ম্যাচে নিয়েছেন ২৯ উইকেট, সঙ্গে ব্যাট হাতে করেছিলেন ১৮৩ রান। এমনকি গ্রেসের সঙ্গে তার বেশ সুসম্পর্কও ছিল। গ্রেসকে কথা দিয়েছিলেন যেকোনো সময় সে গ্লস্টারশায়ারের হয়ে খেলতে রাজি। পরের মৌসুমে অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে অজিদের হয়ে ইংলিশ সফর করেন বিলি। সে বছরের ২০ জুন, তার ২৭তম জন্মদিনের একদিন পরে চমকে ওঠার মতো ঘটনার সাক্ষী হন মিডউইন্টার।

অ্যাশেজ সিরিজের আগে লর্ডসে মিডলসেক্সের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নামার কথা ছিল বিলির। ম্যাচের আগেই বড় ভাই ই এম গ্রেস এবং উইকেট রক্ষক জেমস বুশের সঙ্গে ট্যাক্সি করে ডব্লিউ জি গ্রেস ছুটে যান অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিংরুমে।

সেখান থেকে একরকম ‘কিডন্যাপ’ করেই বিলিকে নিয়ে যান ওভালের মাঠে হওয়া গ্লসটাশায়ার-সারে ম্যাচ খেলার জন্য। ততক্ষণে টস জিতে গ্লস্টারশায়ার আগে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অজি অধিনায়ক ডেভ গ্রেগরি অনেক চেষ্টা করেও গ্রেসকে আটকাতে পারেননি। বেচারা বিলি এই কারণে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সেই ম্যাচে নামতে পারেননি! পরে ঐ মৌসুমে বিলিকে অস্ট্রেলিয়া দলে আর ডাকাই হয়নি, তাই কাউন্টি দলের হয়ে খেলার পাশাপাশি বিলি এরপর খেললেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে। ১৯৮১/৮২ মৌসুমে ইংলিশদের হয়ে অজিদের বিপক্ষে চারটি টেস্ট ম্যাচ খেললেন, পরের মৌসুমে আবার খেললেন অজিদের হয়ে ছয়টি টেস্ট! সবগুলোই আবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে!

দল থেকে বাদ
অ্যারন ফিঞ্চ

কিটব্যাগ না আনায় দল থেকে বাদ পড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান বর্তমান টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ। ২০১৭ আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে গুজরাট লায়ন্সের বিপক্ষে ম্যাচ। যথাসময়ে রাজকোটে এসে পৌঁছায়নি গুজারট ওপেনার অ্যারন ফিঞ্চের কিটব্যাগ। তাই সে ম্যাচে মাঠে নামা হয়নি এই অজি তারকার। তবে তার সতীর্থ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম জানিয়েছিলেন ব্যাগ হারানোর দোষটা ফিঞ্চের ছিলই না।

এই তো গেল কিটব্যাগ না থাকায় দল থেকে বাদ পড়া, ম্যাচের আগে হোম ওয়ার্ক না করায় দল থেকে বাদ পড়ার ঘটনাও আছে। সেখানেও অস্ট্রেলিয়া! ২০১৩ সালের ভারত সফরের দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারে অজিরা। সে ম্যাচে পরাজয়ের পর অস্ট্রেলিয়া দলের সবাইকে বিশেষ এক বার্তা পাঠিয়েছিলেন কোচ মিকি আর্থার।

সেখানে বলা হয়েছিল, পরের টেস্টে কীভাবে নিজেদের খেলা উন্নতি করা যায় সেই বিষয়ে সবাই যেন বিস্তারিত লিখে। তবে শেন ওয়াটসন, উসমান খাজা, জেমস প্যাটিনসন ও মিচেল জনসন মিকির ওই মেইলের উত্তর দেননি, এই চারজন উত্তর না দেওয়ায় পরের টেস্টে তাদের ঠিকানা হয় ডাগআউট।

আবারও মজার কারণে বাদ পড়া, আবারও সেখানে অস্ট্রেলিয়া। এবারের ঘটনা অজি সাবেক ওপেনার ম্যাতঘু হেইডেন। আঙ্গুলের চোট ছিল, শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচে আঙ্গুলে আঘাত পেয়েছিলেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে অ্যাশেজের আগে প্রস্তুতি ম্যাচের জন্য নিজেকে ফিট রাখতে সকাল সকাল একটু দৌড়াতে বের হয়েছিলেন এই অস্ট্রেলিয়ান সাবেক তারকা।

তখনই এক পাগলাটে কুকুর তাকে ধাওয়া করলো। প্রায় কয়েকশ মিটার তাড়া করার পর ক্ষান্ত দিয়েছিল কুকুরটি। কিন্তু এর মাঝেই একবার পরে গিয়ে গোড়ালিতে চোট পেয়েছিলেন হেইডেন। ফলে আরও অনেকদিন বিছানাতেই থাকতে হয় তাকে, যে প্রস্তুতি ম্যাচের জন্য এত দৌড় ঝাপ মিস করেছেন সেই প্রস্তুতি ম্যাচটাও।

আবারও এই তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, এবার নামটা হেইডেনের সাবেক সতীর্থ অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, সেটা আবার বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০০৮ সালের ওয়ানডে সিরিজে! ভোরবেলা উঠে মাছ ধরতে বসে গিয়েছিলেন পাশের পুকুরে। সেদিনই যে দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, সে কথা জানতেনও না বেচারা সাইমন্ডস। নিজের ফোনটাও বাসায় ফেলে এসেছিলেন। তাই সেই সিরিজের তৃতীয় ম্যাচ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল এই ঝাকড়া চুলের অলরাউন্ডারকে।

 

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমাদের “যোগাযোগ” আর্টিকেলটি ভিজিট করুন।

আরও পড়ুন:

 

মন্তব্য করুন