নাদাল-ফেদেরার; প্রতিদ্বন্দ্বি নাকি বন্ধু?

নাদাল-ফেদেরার; প্রতিদ্বন্দ্বি নাকি বন্ধু? : প্রতিদ্বন্দ্বি মানে নাকি রেশারেশি, হানাহানি, কথার যুদ্ধ। যুগ যুগ ধরে এই বাক্যই তো গেলানো হচ্ছে সবাইকে। অন্যকে মেরে উপরে ওঠা, দাবিয়ে রাখা। সবকিছুর যেমন ভাষা থাকে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষাও বোধহয় তাই, ‘বৈরিতা’! তবে বৈপরত্যের স্রোতে দুটো নাম, রজার ফেদেরার [ Roger Federer ] আর রাফায়েল নাদাল [ Rafael Nadal ]।

নাদাল-ফেদেরার
নাদাল-ফেদেরার

বর্তমান সময়ের দুই ফুটবল কিংবদন্তি, লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প কে না জানে। মাঠে দুজনে কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। মাঠের বাইরে অনেকটাই ব্যতিক্রম।

একবার ব্যালন ডি অর অনুষ্ঠানে পর্তুগিজ সুপারস্টার দাবী করেছিলেন তারা বন্ধু হয়তো হতে পারেননি, তবে তারা শত্রুও নন! তবে টেনিসে যাদের বলা হয়ে মেসি-রোনালদো, সেইনাদাল-ফেদেরার  ঠিকই একে অপরের বন্ধু। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়ের পাশাপাশি রাস্তাও পেরোন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে!

২০২০ সালের কথা, তখন পর্যন্ত টেনিস ইতিহাসের সর্বোচ্চ গ্র্যান্ডস্ল্যামের মালিক সুইস তারকা ফেদেরার। অক্টোবরে নোভাক জোকোভিচকে ফরাসি ওপেনে হারিয়ে ফেদেরারের রেকর্ডে ভাগ বসান রাফায়েল নাদাল [ Rafael Nadal ]।

নাদাল-ফেদেরার দুজনের গ্র্যান্ডস্ল্যাম সংখ্যা তখন ২০! নিজের রেকর্ড প্রতিদ্বন্দ্বি ভাঙ্গার পর যেখানে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক, সেখানে উল্টো পথে ফেদেরার। রাফায়েল নাদাল [ Rafael Nadal ]কে ভাঁসালেন প্রশংসার সাগরে।

তাদের দ্বৈরথ ক্রীড়া ইতিহাসেই অসাধারণ এক লড়াই। দু’জনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতোই টেনিস কোর্টের বাইরে দুই কিংবদন্তির বন্ধুত্বও বিরল। দু’জনের বিনয় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দেখা গেছে বহুবার, নিজের ২০ তম গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়ের পর রাফায়েল নাদাল [ Rafael Nadal ] শুনিয়েছেন তাদের বন্ধুত্বের গল্প।

“সবসময় প্রতিবেশির খুশিতে আপনি অখুশি হতে পারেন না। আমার ধারণা আমি যখন জিতি রজার খুশি হয়, একই কথা ওর ক্ষেত্রেও। ও জিতলে আমিও খুব খুশি হই। রজারের সঙ্গে ২০টা গ্র্যান্ডস্ল্যাম ভাগাভাগি করে নেওয়াও সম্মানের”

তখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০০১ সাল, উইম্বলডনে তৎকালিন চ্যাম্পিয়ন পিট সাম্প্রাস। টুর্নামেন্টে এর আগে জিতেছেন সাতটি ট্রফি, সঙ্গে ঘাসের কোর্টে তার দারুণ আধিপত্য। এছাড়া সবচেয়ে বেশি ট্রফি জেতার রেকর্ড তো আছেই, সব মিলিয়ে সেবারও সাম্প্রাসকেই ভাবা হচ্ছিল ফেভারিট।

নাদাল-ফেদেরার
নাদাল-ফেদেরার

তবে তার শিরোপা জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো মাত্র ১৯ বছর বয়সী সুইস তরুণ ফেদেরার, ঝাঁকড়া চুলের ফেডির এমনকি ছিল না তেমন কোনো নামডাক। সেবার চতুর্থ রাউন্ডে পাঁ সাম্প্রাসকে হারিয়ে দেন অচেনা ফেদেরার। হার না মানা মানসিকতার ফেদেরার যে হাতে তুলে নিলেন সাম্প্রাসের শ্রেষ্টত্বের ব্যাটন।

দুই বছর বাদে, অর্থাৎ ২০০৩ সালে উইম্বলডন জিতে শ্রেষ্টত্বের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন ফেদেরার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টেনিসের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন গ্র্যান্ড স্লাম বলা হয় উইম্বলডনকে, সবমিলিয়ে এই প্রতিযোগিতা ফেডি জিতেছেন আটবার। সঙ্গে ট্রফির শো-কেসে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ট্রফি ৬ টা আর ৫ বার জিতেছেন ইউএস ওপেন। আলোর মাঝে যেমন অন্ধকার থাকে, ফেদেরারের অন্ধকার ফ্রেঞ্চ ওপেন। ‘ক্লে কোর্টে’ ফেদেরারের সাফল্য বলতে মাত্র একবার।

কিংবদন্তিরা যেমন হন, তেমনই ছিলেন নাদাল-ফেদেরার। একটাতে পারেননি তো বাকিগুলোয় ঠিকই পুষিয়ে নিতেন। উইম্বলডন, ইউএস ওপেন কিংবা অস্ট্রেলিয়ান ওপেন- সবখানে যেখানে ফেদেরারের শ্রেষ্টত্ব, ক্লে কোর্টের রাজা সেখানে নাদাল।

ফ্রেঞ্চ ওপেনে ফেদেরারের মাত্র একবার শিরোপা জয়ের পরিসংখ্যান যেখানে বলে দিচ্ছে প্রতিযোগিতায় তার দুর্বলতার কথা, সেখানে প্রতিদ্বন্দেইর দুর্বল জায়গাকেই যেন নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বেছে নেন নাদাল। শুধুমাত্র লাল দুর্গেই নাদালের গ্র্যান্ড স্লাম সংখ্যা ১৩টি।

তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে, তবে সবার মতামত অভিমত মিলে যাবে এক বিন্দুতে। ফ্রেঞ্চ ওপেন আর রাফায়েল নাদাল, নিঃসন্দেহে ‘ক্লে কোর্টে’র একমাত্র রাজা নাদাল। মোটা দাগে এককভাবে ক্লে কোর্ট দিয়েই ফেদেরারের সিংহাসনে ভাগ বসিয়েছেন এই স্প্যানিশ।

যার শুরু ২০০৫ সালে, ফেদেরার তখন একপ্রকার উড়ছেন। যদিও এর আগের বছর নাদালের সঙ্গে হেরেছিলেন। তখন বিশ্বের একনম্বর টেনিস তারকা ছিলেন রজার ফেদেরার, র‌্যাংকিংয়ের প্রসঙ্গ যখন আসলো তখন জানিয়ে রাখা ভালো- ফেদেরার রেকর্ড টানা ২৩৭ সপ্তাহ র‌্যাংকিংয়ের চূড়ায় ছিলেন। যেখানে নাদাল শীর্ষে ছিলেন টানা ২০৯ সপ্তাহ।

তখনকার বিশ্বের একনম্বর তারকা ফেদেরার সরাসরি সেটে হেরে যান ১৭ বছরের অখ্যাত স্প্যানিশ তরুণ নাদালের কাছে, তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় যা রীতিমতো অঘটন। কেননা পেশাদার টেনিসে নাদালের অভিষেক হয়েছে মাত্র এক বছর আগে। আর সেই আসরে তৃতীয় রাউন্ড পর্যন্ত কোয়ালিফাই করা প্রতিযোগিদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন নাদাল।

তবে তার পরের বছর অর্থাৎ ২০০৫ সালে যা করেছিলেন তাতে আগের বছরের ঘটনা আর অঘটন হওয়ার কথা নয়। সেবারের ফ্রেঞ্চ ওপেনে আবার হারিয়ে দিলেন ফেদেরারকে। এমনকি সেই আসরে জিতলেন শিরোপা। ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে আর্জেন্টাইন তারকা মারিয়ানো পুয়েত্রাকে পরাজিত করেন তিনি।

একই বছর জেতেন বার্সেলোনা ওপেন, রোম ওপেনের শিরোপা। ফলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো টেনিস র‍্যাংকিংয়ে তিন নম্বরে উঠে আসেন তিনি। ততদিনে নাদালের উত্থান পরিস্কার, আর ফেদেরার মনে মনে ভাবতেই পারেন যোগ্য সঙ্গী তিনি পেয়েছেন।

সেই থেকে লড়াইয়ের ইতিহাস শুরু হয়েছে, হয়তো যা চলবে অনন্তকাল ধরে। মাঝের সময়টায় হয়েছে শ্রেষ্টত্বের পরিমাপ। যে পরিমাপেও কোনো উনিশ বিশ নেই। সেই প্রথমের মতো, কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান।নাদাল-ফেদেরার দুজনই বিশ বিশ।

টেনিসের শ্রেষ্টত্ব মাপার যে মাপকাঠি, সেই গ্র্যান্ডস্ল্যামে নাদাল-ফেদেরার দুজনেই আছেন সহাবস্থানে, দুজনেই জিতেছেন ২০টা করে। মূলত নাদাল ফেদেরারের লড়াইয়ের গল্প, না শেষ হওয়া এক উপাখ্যান।, যা চলবে যুগ-যুগ ধরে, অনন্তকাল ধরে।।

নাদাল-ফেদেরার; প্রতিদ্বন্দ্বি নাকি বন্ধু?

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন