ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে [ The way the football world cup started ]

ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে [ The way the football world cup started ] : ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, প্রশ্ন হচ্ছে আসলে কতটুকু জনপ্রিয়? এই উত্তর পেতে একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ঠ। জাতিসংঘের দেশ যেখানে ১৯৩টি সেখানে ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল এসোসিয়াশনের (ফিফা) সদস্য সেখানে ২১১টি। দর্শক জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফুটবল কেন সবার উপরে সেটা বুঝাতে ফিফার এই পরিসংখ্যানই যথেষ্ঠ।

ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে
ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে

এত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক খেলা হিসেবে খুব সহজেই স্বীকৃতি পায়নি ফুটবল। এমনকি ফুটবল এত জনপ্রিয়ও ছিল না, জনপ্রিয়তা অর্জন করতে না পারায় শুরুর দিকে ফুটবলকে প্রফেশনাল খেলার মর্যাদাও দিতে চায়নি অলিম্পিক। সেখান থেকে কত চড়াই উতরাই পেরিয়ে ফুটবল আজকে এই জায়গায়, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ফুটবল বিশ্বকাপ আজকে সবার আগ্রহের জায়গা।

প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে। ১৮৭২ সালে স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচই আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম ম্যাচ। যদিও এর আগে দুদল ৫ বার একে অন্যের মুখোমুখি হয়েছিল, তবে সেগুলো ছিল আনঅফিসিয়াল ম্যাচ। এরপর ১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ হোম চ্যাম্পিয়নশিপ নামে একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়, যেটি কিনা ফুটবলের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। তখন গ্রেট বৃটেন এবং আয়ারল্যান্ডের বাইরে ফুটবল খেলা অতটা বিস্তার লাভ করেনি।

ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে

আঠার শতকের শেষের দিকে ফুটবল বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। জনপ্রিয়তা বাড়ায় ১৯০০, ১৯০৪ এবং ১৯০৬ অলিম্পিকে স্থান পায় ফুটবল। তবে সেটা প্রদর্শনীমূলক খেলা হিসেবে। আর সেই খেলার জন্য কোনো পুরস্কারও রাখা হয়নি। তবে পরের আসর অর্থাৎ ১৯০৮ অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো ফুটবলকে আনুষ্ঠানিক খেলা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়।

তখন ফুটবল এসোসিয়েশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী অলিম্পিক ফুটবল ছিল অপেশাদার খেলোয়াড়দের জন্য। আর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করার পরও প্রতিযোগিতার থেকে খেলাটিকে প্রদর্শনী হিসেবেই দেখা হতো। তাই ১৯০৮ এবং ১৯১২, পরের দুই আসরেই খেলে অপেশাদার ফুটবল দল। ঐ দুই আসরের স্বর্ণপদক জিতেছিল গ্রেট ব্রিটেন, যাদের প্রতিনিধিত্ব করেছিল ইংল্যান্ড অপেশাদার ফুটবল দল।

১৯০৪ সালে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের প্রচার এবং প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিফা, প্রতিষ্ঠিত হয়েই ১৯০৬ সালে সুইজারল্যান্ড অলিম্পিকের পর ভিন্ন একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে ফুটবলের অভিভাবক স্বংস্থা। মূলত ধারণা করা হয় ১৯০৮ অলিম্পিকে জায়গা পাওয়ার কারণ এই টুর্নামেন্টই। তবে ফিফার ইতিহাসে এই টুর্নামেন্টকে ব্যর্থ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, কেননা অনেকটা অলিম্পিকের আদলেই টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছিল।

ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে

একেই চলছিল অলিম্পিকে অপেশাদার খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা, সেখানে স্যার থমাস লিপটন ১৯০৯ সালে ইতালির তুরিনে ‘স্যার থমাস লিপটন’ ট্রফি নামে আরেক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এটি এমন একটা প্রতিযোগিতা ছিল যেটা বিভিন্ন দেশের জাতীয় দল নয়, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতা। অনেকেই এটাকে প্রথম বিশ্বকাপ বলে থাকেন, কেননা এসব দলের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

এই টুর্নামেন্টে ইতালি,জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় পেশাদার ক্লাব অংশ নেয়। তবে ইংল্যান্ড এই প্রতিযোগিতায় পেশাদার ক্লাব পায়হাতে অস্বীকৃতি জানায়, এমনকি এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে জড়িত থাকতেও অস্বীকার করে। তাই বাধ্য হয়ে লিপটন ইংল্যান্ডের ব্যানারে পশ্চিম অকল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানান, যেটা কিনা ডারহাম কাউন্টির একটা অপেশাদার দল। ভাগ্যের কি খেল! সেই অকল্যান্ডই এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। এবং টুর্নামেন্টের পরবর্তী আসর, ১৯১১ সালেও শিরোপা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী আজীবনের জন্য ট্রফি তাদের দিয়ে দেওয়া হয়।

ততদিন পর্যন্ত অলিম্পিক ফুটবলের কোনো অস্তিত্ব ফিফার কাছে ছিল না। ১৯১৪ সালে অলিম্পিক ফুটবলকে ‘অপেশাদার ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ’ নামে স্বীকৃতি দেয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। শুধু স্বীকৃতিই দেয়নি, টুর্নামেন্টের দায়িত্বও নেয় ফিফা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে বিশ্বের প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। যেখানে ইউরোপের ১৩টি ক্লাবের পাশাপাশি অংশ নেয় আফ্রিকান দেশ মিশর। এই টুর্নামেন্টের স্বর্ণপদক জিতে নেয় বেলজিয়াম।

পরের দুই অলিম্পিক আসর, অর্থাৎ ১৯২৪ এবং ১৯২৮ সালে পরপর দুইবার অলিম্পিক ফুটবলের শিরোপা জেতে উরুগুয়ে। ১৯২৮ অলিম্পিক শেষে অলিম্পিকের বাইরে ফিফা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আলাদা প্রতিযোগিতার আয়োজন করার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনারই অংশ ১৯৩০ ফুটবল বিশ্বকাপ।

ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে

১৯৩২ অলিম্পিকের ভেন্যু ছিল লস এঞ্জেলস। সেই অলিম্পিকে ফুটবল না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কেননা যুক্তরাষ্ট্রে তখন ফুটবল অতটা জনপ্রিয় ছিল না। আমেরিকানরা প্রথাগত ফুটবলকে সকার বলে, তাদের দেশে সকারের বদলে তখন জনপ্রিয় ছিল আমেরিকান ফুটবল যেটা অনেকটা রাগবি সদৃশ ফুটবল। এছাড়া ফিফা এবং অলিম্পিক কমিটির মধ্যে অপেশাদার খেলার মর্যাদা দেওয়া নিয়েও ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এত এত বাধা সামলে ঐ আসরে ফুটবল মাঠে গড়ানো সম্ভব ছিল না।

অলিম্পিকে ফুটবলের স্থান দিতে না পারলেও বসে থাকেননি ততৎকালীন ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে। ১৯৩২ অলিম্পিকের আগেই ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিভিন্ন দেশকে নির্বাচন করে তাদের জাতীয় ফুটবল সংস্থাকে অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তবে যতটা সহজ ঠেকছে ততটা সহজ ছিল না সবকিছু।

উরুগুয়েতে বিশ্বকাপ আয়োজনের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আসতে হতো। যেটা একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্য্যবহুল। ফলে প্রতিযোগিতা শুরুর দুই মাস আগেও ইউরোপের কোনো দল তাদের স্কোয়াড পাঠাতে সম্মত হয়নি। তবে জুলে রিমে ঠিকই ইউরোপিয়েন দল ‘ম্যানেজ’ করতে সক্ষম হন। বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া এবং যুগোস্লাভিয়া ইউরোপ থেকে প্রতিনিধিত্ব করে। লাতিন আমেরিকা থেকে ৭, আর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা থেকে দুটো করে দল অংশ নেয় প্রথম বিশ্বকাপে।

মূলত আয়োজক হিসেবে উরুগুয়েকে বেছে নেওয়ার পেছনে দুটো কারণ ছিল, প্রথম কারণ টানা দুই অলিম্পিক আসরে উরুগুইয়ানদের একক আধিপত্য। অন্য কারণটা অনেকটা রাজনৈতিক, উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন। প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিকরাই।

[ ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে ]

“ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু যেভাবে [ The way the football world cup started ]”-এ 12-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন