ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০, কেন খেলেনি ভারত?

ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০, কেন খেলেনি ভারত? ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের রমরমা বাজারে মাসখানেক পরপরই ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্রেকে’ যায় ফুটবলাররা। অর্থাৎ ক্লাব জার্সি ছেড়ে দেশের জার্সি গায়ে জড়ানো। প্রীতি ম্যাচ, বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ছাড়াও বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থাকে চাহিদার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। অর্থাৎ ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা নিয়েই সবার যত মাতামাতি।

ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে ‘দ্য হার্ডেস্ট সেভেন মিনিটস ইন ফুটবল হিস্টোরি’ লিখে সার্চ করে দেখতে পারেন, যে ভিডিওটা আসবে সেটা হয়তো আপনাদের সবারই দেখা। যেটা ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের আফ্রিকান অঞ্চলের ম্যাচ। যে ম্যাচে মাঠে নামে মিশর এবং কঙ্গো। সেই ৭ মিনিট বুঝিয়ে দেয় ফুটবলের মাহাত্ম্য, সেই ৭ মিনিটে অনেকের চোখ দিয়ে কান্না ঝড়েছে।

ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০
ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০

সেই ভিডিও দেখে মোহম্মদ সালাহের সঙ্গে কেঁদেছেন অনেকেই। দিনশেষে সবটাই ঐ বিশ্বকাপে খেলার জন্য। তবে যদি বলি বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েও খেলেনি ভারত, তাহলে একটু অবাকই হয়তো হবেন। আপনার অবাক হওয়ার সীমানা পেরিয়েও যেতে পারে, ভারত বিশ্বকাপ খেলেনি কারণ তারা খালি পায়ে খেলার বায়না ধরেছিল বলে! তবে এ কথা পুরোপুরিও সত্য নয়।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভারতের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো। ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলার জন্য পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে দেশটা। খেলায় পেশাদারিত্ব বেড়েছে, আই-লিগ, ইন্ডিয়ান সুপার লিগের (আইএসএল) মতো বড় টুর্নামেন্টও আয়োজন করছে নিয়মিত। ফুটবল র‍্যাঙ্কিংয়েও আছে একশর আশেপাশেই। তবুও ফুটবলে এই বিবর্তন ভারতীয়দের বিশ্বকাপ অব্দি পৌঁছে দিতে পারেনি, যে বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে এতকিছু সেই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হেলায় হারিয়েছিল ‘টিম ইন্ডিয়া’।

বৃটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পরের সময়টাই ভারতীয় ফুটবলের সোনালী যুগ। ফুটবল নিয়ে ভারতীয় উপন্যাস কিংবা কলকাতার সিনেমা হতে পারে এ কথার স্বপক্ষে প্রমাণ। ১৯৪৭ সাল থেকে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবল ছিল বেশ আগানো। তারা প্রথমবার ফুটবল বিশ্বের নজরে পড়ে ১৯৪৮ সালে।

সেই অলিম্পিকে শেষ মুহুর্তের গোলে ফ্রান্সের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে গেলেও লড়াকু মনোভাবে সবার মন জয় করে নেয় ভারত। লন্ডন অলিম্পিকে ভারতীয়দের এমন পারফর্ম্যান্স মুগ্ধ করে ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জকে। মুগ্ধ হয়ে রীতিমতো বাকিংহ্যাম প্যালেসে পুরো ফুটবল দলকে আমন্ত্রন জানান।

যে ব্রিটিশদের হাতে প্রায় ২০০ বছর শোষনের শিকার হতে হয়েছে, সেই ব্রিটিশ রাজ দরবার থেকেই আসা নিমন্ত্রণ ভারতীয় ফুটবল দল তো বটেই ভারতীয় রাজনীতির জন্যও ছিল বেশ গর্বের। ঐ অলিম্পিকে ভারত খেলে বুট ছাড়া। কেউ নামছেন খালি পায়ে, কেউ আবার শুধু মোজা জড়িয়ে।

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সেই প্রভাব পড়েছিল খেলার মাঠেও। ডন ব্র্যাডম্যানের মতো ক্রিকেটারের ক্রিকেট জীবন থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল প্রায় ১০টা বছর। ১৯৩৮ বিশ্বকাপের পর টানা দু’টি বিশ্বকাপের আসর, অর্থাৎ ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ বিশ্বকাপ পন্ড করে দিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১২ বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৫০ সালে আয়োজিত হয় বিশ্বকাপ, লাতিন জায়ান্ট ব্রাজিলের মাটিতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইউরোপেই, তাই সেই বিশ্বকাপ আয়োজনে রাজি ছিল না ইউরোপের কোনো দেশ। জুলে রিমে টুর্নামেন্টের আয়োজনের দায়ভার পড়ে ব্রাজিলের ওপর। বিশ্বযুদ্ধে সম্পৃক্ততার কারণে সেই বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ হয় জার্মানি ও জাপান। তখনকার নিয়ম অনুসারে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করত ১৬টি দেশ।

স্বাগতিক হওয়ায় ব্রাজিল আর সর্বশেষ আসরের চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ইতালি ছিল সেই ফুটবল বিশ্বকাপের ‘অটো চয়েস’। বাকি চৌদ্দটা দলের মধ্যে এশিয়া থেকে একটা আর সাতটি ইউরোপিয়ান দেশের অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। বাকি ছয়টা জায়গা বরাদ্দ ছিল দুই আমেরিকা মহাদেশের জন্য।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক স্বংস্থা ফিফা আর বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ব্রাজিল ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও ভারত এই চারটি দেশকে আমন্ত্রন জানায়। মায়ানমার বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানালে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ আসে ভারতের সামনে।

লাতিনের দেশ, তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশ সময় এবং খরচ সাপেক্ষ। তবে আয়োজক ব্রাজিল যাতায়াতের সব খরচ বহনের আশ্বাস দেয়। তবুও বিশ্বকাপে যায়নি ভারত। একটা মিথ চালু আছে, ফিফা বিশ্বকাপে খালি পায়ে খেলার অনুমতি দেয়নি। তবে ভারতীয় ফুটবল দল খালি পায়েই খেলতে চায়। তাদের গোয়ার্তুমি ধোপে না টেকায় নাকি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলা হয়নি ভারতের।

তবে আসল সত্যটা সেটা নয়। মূলত ভারতীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক স্বংস্থা অল ইন্ডিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এআইএফএফ) নিজেরাই নাম প্রত্যাহার করে নেয়। কেননা তারা তখন বিশ্বকাপের গুরুত্বই বুঝে উঠতে পারেনি। তাদের কাছে তখনও অলিম্পিকই ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।

তবে সত্যি কথা বলতে দোষটা একা ভারতের না, তখন ফুটবল বিশ্বকাপের গুরুত্ব অনেক বড় দেশই বুঝে উঠতে পারেনি। আর্থিক কারণে সেই আসরে খেলেনি তুরস্ক, এমনকি ফ্রান্স-পর্তুগালের মতো দলগুলো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হারিয়েছেন তখন।

ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০
ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০,

ভারত বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয় আরেকটি কারণে, সেটা ফুটবলারদের ফিটনেস ঘাটতি। ৯০ মিনিট খেলার জন্য অভ্যস্ত তখন ছিল না ভারতীয় খেলোয়াড়রা। এমনকি ঘরোয়া লিগে খেলা হতো খেলতো ৭০ মিনিট করে। ৭০ মিনিটের ফুটবল, পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা কে জানে…

আরেকটা কারণ ১৯৫১ সালে এশিয়ান গেমসের আয়োজক ছিল ভারত, দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হওয়া এই এশিয়ান গেমসেই ছিল ভারতের সকল নজর। তবুও ভারতকে বিশ্বকাপে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায় ব্রাজিল, অনুশীলনের সময়ের অভাব দেখিয়ে একদম শেষ মুহূর্তে গিয়ে ব্রাজিল ও ফিফাকে না করে দেয় ভারত।

পরে অবশ্য ভারত নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছিল। সেই ফুটবল বিশ্বকাপে না, পরের আসরে। ১৯৫৪ আসরে ভারত নিজে থেকেই ফিফার কাছে বিশ্বকাপ খেলার আবেদন করে। তবে আগেরবার নিজেরা যেচে অপমানিত হওয়ার কথা ভুলে যায়নি ফিফা, এবার তারাই ভারতের আবেদন বাতিল করে দেয়।

১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খেলে। বাছাইপর্বে ভারতের গ্রুপে ছিল বাংলাদেশ, বাকি দুই দল ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেরই বাছাইপর্ব খেলেছে ভারত।

ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০, কেন খেলেনি ভারত?

আরও পড়ুন:

“ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৫০, কেন খেলেনি ভারত?”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন