ভারত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াই কি এখন রুপকথা?

ভারত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াই কি এখন রুপকথা : দুটো দেশই প্রায় ২০০ বছর ছিল বৃটিশদের উপনিবেশ। বৃটিশদের শোষন কিংবা বঞ্চনা ভোগ করেছে একই মায়ের পেটের দুই ভাইয়ের মতো। ভারতবর্ষের দুটো দেশ ভারত আর পাকিস্তান তবুও এক হতে পারেনি কোনোদিন। চিরকালীন বৈরিতা তাদের আলাদা করে রেখেছে। মাঠের খেলাও এই সম্পর্ক জোড়া লাগাতে পারেনি।

ভারত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াই কি এখন রুপকথা?
ভারত-পাকিস্তান

মাঠের খেলার থেকে কখনো কখনো মাঠের বাইরের রাজনীতিই বড় হয়ে ওঠে। মাঠের খেলা দিয়ে সেই রাজনীতিকে সামাল দেওয়া তো দূরে থাক, এমনকি মাঠের খেলাই বন্ধ হয়ে গেছে রাজনীতির বলি হয়ে। বলছিলাম ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটের লড়াইয়ের কথা। দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বিদের মাঠের ধ্রুপদী লড়াই আজ মৃতপ্রায়। কারণটা ঐ মাঠের বাইরের রাজনীতি।

ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় লড়াই কোনটা? উত্তরে অনেকে অ্যাশেজের নাম টানতেই পারেন। তবে মাঠের টানটান উত্তেজনা, মাঠের বাইরের লড়াই কিংবা দর্শক উন্মাদনা মিলিয়ে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের ধারেকাছেও কোনোকিছু নেই। প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে খেলার মাঠে।

সমর্থকদের মধ্যে যেমন কথার লড়াই চলে তেমনিভাবে কথার লড়াই কিংবা শারীরিক ভাষায় নিজেদের দ্বন্দ্বের কথা জানান দেন ক্রিকেটাররাও। ইউটিউবে সার্চ করলেই এমন অনেক অনেক গল্পের স্বাক্ষী হয়ে যাবেন আপনিও। ফলে বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনীর মতো অবস্থা। কেউ কাউকে একবিন্দুও ছাড় নয়। তবে ছাড় সবসময়ই কম দিয়ে এসেছে ভারত। ক্রিকেটের তিন মোড়লের একটা বলে কথা।

দুই দেশের রাজনীতির দ্বন্দ্বের শিকার হচ্ছেন আসলে দর্শকরা। দীর্ঘদিন সত্যিকারের ক্রিকেট মাঠের লড়াই থেকে থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভক্ত সমর্থকরা। দুদল সর্বশেষ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেছে আজ থেকে ৯ বছর আগে, ২০১২ সালে ভারতের মাটিতে। ভারত পাকিস্তান সফর করেছে, ১৪ বছর আগে। সেবার টেস্ট সিরিজ খেলতে পাকিস্তানে গিয়েছিল ভারতীয়রা।

মাঝের সময়টায় এই লড়াই বলতে আইসিসি ইভেন্টগুলোতে কয়েকটা ম্যাচের পাশাপাশি মন্দের ভালো এশিয়া কাপ। আইসিসি ইভেন্টে এমনিতেই ভারতের কাছে পাত্তা পায় না পাকিস্তান, তার উপরে শেষ কয়েক বছরে ভারতের অভাবনীয় উন্নতি পাকিস্তানের জন্য আরো কঠিন করেছে। এমনকি দর্শকরাও বঞ্চিত হচ্ছেন মাঠের লড়াই থেকে।

বর্তমান ক্রিকেট বাজারের ‘ক্রেজ’ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। টপ লেভেলের ক্রিকেট ডিসপ্লে দেখা যাওয়ায় পৃথিবীর যেকোনো ক্রিকেটার যেকোনো মূল্যে আইপিএল খেলতে চান। শুধুই ভালো ক্রিকেট নয়, টাকার ঝনঝনানিও এখানে বড় ফ্যাক্টর। সেই আইপিএলেও খেলতে পারেন না পাকিস্তানিরা। কারণটাও রাজনীতি। যদিও বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানি বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার আইপিএলে খেলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।

২০০৮ সালে আইপিএলের প্রথম আসরে খেলেছিলেন ১১ জন পাকিস্তানি ক্রিকেটার। সালমান বাট, শোয়েব মালিক, ষোয়েব আখতার, সোহেল তানভীরের মতো ক্রিকেটাররা মাঠ মাতিয়েছেন। সেবারই শুরু, সেবারই শেষ। এরপর আর কখনোই আইপিএলে খেলা হয়নি তাদের। মূলত সে বছর মুম্বাইয়ে বোমা হামলায় অনেকের প্রাণ যাওয়ায় ভারতীয় সরকার দাবী করে ঘটনায় পাকিস্তানিদের হাত হাছে। এরপর আস্তে আস্তে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে অবনতি ঘটে।

পরের বছর ছিল আবার ভারতের নির্বাচন। সবকিছু মিলিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয়। তাই সাউথ আফ্রিকায় হওয়া দ্বিতীয় আসরে ক্রিকেটার পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায় পিসিবি। ভারতীয় বোর্ডও আর পাকিস্তানি ক্রিকেটার খেলানোর মতো আগ্রহ দেখায়নি। নিজেদের সেই অবস্থান থেকে এখনো সরে আসার কোনো ইচ্ছেও পরবর্তিতে দেখা যায়নি পাকিস্তান বোর্ডের মধ্যে। কেননা ঘটনা শীতল হতে পারতো একমাত্র দু দেশের সরকারের হস্তক্ষেপে। তা আর হয়নি।

ভারত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াই কি এখন রুপকথা?
ভারত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াই

তবে মাঠের লড়াই নিয়মিত দেখা না গেলেও ভারত-পাকিস্তান মাঠে নামলেই দেখা মেলে চিরচারিত দৃশ্যের। চায়ের কাপে ঝড় ওঠে, কথার মেলা ছোটে। বিশ্লেষণ চলে, কে কেমন করবে, কে জিতবে কে হারবে- চলে যুক্তি-তর্ক। সেই যুক্তির খন্ডন চলে, নতুন নতুন দিকে আলোচনা চলে। যে আলোচনার সূচনা হয়েছে ১৯৫২ সালে, প্রায় ৭০ বছর ধরে চলা এই আলোচনা চলবে অনন্তকাল ধরে।

ভারত-পাকিস্তান প্রথম মুখোমুখি হয় ১৯৫২ সালের ১৬ অক্টোবর। টেস্ট বাদে আর কোনো ফরম্যাটে তখন খেলা না হওয়ায় সেটা যে টেস্ট ক্রিকেটেই সেটা আর আপনাকে বলে দিতে হচ্ছে না। ৫ ম্যাচ টেস্ট সিরিজের ২য় টেস্টে স্বাগতিক ভারতকে ইনিংস ও ৪৩ রানে হারিয়ে নিজেদের প্রথম জয়ের স্বাদ পায় পাকিস্তান। তবে তার আগের আর পরের ম্যাচ জিতে আর শেষ দুই ম্যাচ ড্র করে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে স্বাগতিক ভারত। সেই থেকে চলছে দুদলের ধ্রুপদী লড়াই।

২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কথা মনে আছে? ঐ বিশ্বকাপে দুইবার ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান। দুইবারই হেরেছেন শহীদ আফ্রিদিরা। তবুও মাঠের উত্তেজনা সব হার জিত দূর করে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচ টাই হওয়ার পর ‘বোল আউটের’ মাধ্যমে ফলাফল নিশ্চিত হয়। বোল আউট হচ্ছে ফুটবলের অনেকটা পেনাল্টির মতো। হাত ঘুরিয়ে বল করে স্ট্যাম্পে লাগাতে হবে। প্রত্যেক দল পাবে ৫টা করে সুযোগ। সেখানে ভারত প্রথম তিনটাতে তিনবারই লাগাতে পারলেও পাকিস্তান পারেনি একটাতেও। ফলাফল, হেরে যায়।

সেই হারের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ ছিল পাকিস্তানের সামনে, সেটাও ফাইনালের মতো বিগ স্টেজে। তবে মিসবাহ উল হকের ছেলেমানুষির জন্য সেটা আর সম্ভব হয়নি। শেষ ওভারে জগিন্দর শর্মাকে স্কুপ করতে গিয়ে শান্তকুমার শ্রীশান্তের হাতে ক্যাচ দেন, ওটাই ছিল শেষ উইকেট। ফলে শিরোপার একদম কাছে পৌঁছেও ছুঁয়ে দেখতে পারেনি তারা। মিসবাহ বনে যান ট্রাজিক হিরো।

আগের সেই বৈরিতা এখন কমে এসেছে। রমিজ রাজা দীর্ঘদিন আইপিএলে ধারাভাষ্য করেছেন। সেই রমিজ এখন পিসিবির চেয়ারম্যান। চাইলেই ক্রিকেটীয় সম্পর্কের কথা ভেবে দেখতে পারেন। তাহলে লাভ হবে দর্শকদেরই।

[ ভারত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াই ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন