মাঠেই মৃত্যু যাদের

মাঠেই মৃত্যু যাদের : ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন, ইতালিয়া ক্লাব ইন্টার মিলানের ‘সাবেক’ এই মিডফিল্ডারকে হয়তো অনেকেই চেনেন। সাবেক বলছি কেননা, সত্যি কথা বলতে তার যে শারীরিক অবস্থা তাতে টপ লেভেলে ফুটবল খেলা তার জন্য কার্যত অসম্ভবের কাছাকাছি। সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারের মাঠে নামা কেন অসম্ভবের কাছাকাছি, সেই ঘটনাটা জানা আছে তো?

ঘটনাটা এই বছরের ১৩ জুনের, ইউরোর এবারের আসরের প্রথম ‘ম্যাচডের’ ঘটনা। ফিনল্যান্ডের মুখোমুখি ডেনমার্ক। ম্যাচের তখন ৪৩ মিনিট, হটাত মাঠেই লুটিয়ে পড়েন ডেনিশ এই মিডফিল্ডার। কারো সঙ্গে সংঘাত নেই, বলের সঙ্গেও দূরত্ব স্পষ্ট! তবুও মাঠে এরিকসেনের জ্ঞান হারানো।

তার জ্ঞান ফেরাতে এগিয়ে আসেন ডেনিশ ক্যাপ্টেন সাইমন কায়ের। তাকে সিপিআর অর্থাৎ মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিয়ে জ্ঞান ফেরান। সেই কাজের জন্য পরে কায়েরকে উয়েফা সম্মানিত করে।

প্রথমে বাতিল করা হলেও এরিকসেনের সুস্থতার সংবাদ পেয়ে সেই ম্যাচ আবার চালু হয়। এরিকসেন সেদিন বেঁচে গেলেও এমন অনেক ফুটবলার আছেন যারা মাঠেই জ্ঞান হারিয়েছেন, তবে সেই জ্ঞান আর ফেরেনি। মাঠের জন্য যাদের জন্ম, মাঠেই তাদের শেষ…

চলতি বছরের জুন মাসেরই ঘটনা। মৃত ভাইয়ের স্মরণে খেলতে নেমে মাঠেই মৃত্যু হয় তারই ভাইর। ঘটনাটা ইতালির নেপলসে ঘটে। ইতালিয়ান ক্লাব পার্মা কালসিওর অখ্যাত খেলোয়াড় জেসিপ্পো পেরিনো হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাঠেই লুটিয়ে পড়েন, যার সবশেষ পরিণতি মাঠেই মৃত্যু । মূলত ম্যাচটা ছিল একটা প্রীতি ম্যাচ, নিজের মৃত ভাইয়ের স্মরণে আয়োজন করা হয়েছিল ম্যাচ।

মাঠেই মৃত্যু
পেরিনো, মাঠেই মৃত্যু যাদের

পেরিনোর ভাই রোকো ২০১৮ সালে সাইক্লিং করতে করতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। শেষে মাঠেই মৃত্যু পরিণতি বরণ করেন। সেই ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর স্মরণে আয়োজিত ফুটবল ম্যাচ খেলতে নেমে একইভাবে হৃদযোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

সেদিন ম্যাচ চলাকালে ২৯ বয়সী এই ফুটবলার মাঠেই বুকে হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রেফারির বাঁশিতে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা মাঠে ছুটে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষমেশ সব চেষ্টাই বৃথা হয়। মাঠেই  মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পেরিনো। এই আকস্মিক মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মার্ক ভিভিয়ান ফো, আফ্রিকান ফুটবল কিংবদন্তিদের একজন। ক্যামেরুনের এই ফুটবলার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে নিউক্যাসল ইউনাইটেড এবং ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবে খেলতেন। মাঠেই যার জীবন, তার জীবনের শেষটাও মাঠেই মৃত্যুর মাধ্যমে।

২০০৩ সালের জুনে ফ্রান্সে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে মাঠে নেমেছিলেন তিনি, ওটাই তার শেষ। ম্যাচের ৭২ মিনিটে মাঠের মাঝখানে আচমকা লুটিয়ে পড়েন ফো। সতীর্থরা ছুটে আসেন, এরপর তাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়, সঙ্গে তার হৃদযন্ত্র বেশ কয়েকবার পাম্প করা হয়। কাজের কাজ কিছুই হয়নি, কোনও সাড়া দেননা তিনি। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় স্টেডিয়ামের মেডিকেল সেন্টারে। যদিও তখন পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান এই ফুটবলার।

এরপর তার ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্তের পর জানা যায়, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই এই মিডফিল্ডার মারা গিয়েছিলেন। চিকিৎসা পরিভাষায় এটাকে হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি বলা হয়। জানা গেছে, এই রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যাক্তির শারীরিক অনুশীলন করার সময়েই মৃত্যুর ঝুঁকি সবথেকে বেশি থাকে।

সেভিয়া এবং স্পেনের উইংব্যাক অ্যান্তোনিও পুয়ের্তা মাত্র ২২ বছর বয়সে প্রাণ হারিয়েছিলেন। লা-লিগার ২০০৭-০৮ মৌসুমে সেভিয়ার প্রথম ম্যাচে গেতাফের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন পুয়ের্তা, ম্যাচ চলাকালীন হঠাৎ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং লুটিয়ে পড়েন।

ম্যাচের মাত্র ৩৫ মিনিটের মাথায় তিনি নিজের গোলের দিকেই জগিং করতে করতে যাচ্ছিলেন। সেই সময়েই এ ঘটনা ঘটে। সতীর্থরা এবং মেডিকেল স্টাফরা মুহুর্তেই তার কাছে এগিয়ে আসেন, পুয়ের্তা নিজেকে সামলেও নেন। হেটে হেটে ড্রেসিংরুমে চলে যান। এরপর আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় তার।

এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন পর তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তার শরীরের একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যায়। আর তারপরেই মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় পুয়ের্তার গার্লফ্রেন্ড সন্তানসম্ভবা ছিলেন। রিয়াল বেতিস এবং সেভিয়া, দুই দলের খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে পুয়ের্তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

মাঠেই মৃত্যু
শেখ তিওতে, মাঠেই মৃত্যু যাদের

শেখ তিওতে, আইভরি কোস্টের এই ফুটবলার মাত্র ৩০ বছর বয়সেই মারা যান। এই আফ্রিকান খেলতেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে, নিউকাসেল ইউনাইটেডের মতো ক্লাবের হয়ে। এমনকি ক্লাবটিতে অসাধারণ একটা ক্যারিয়ার গড়েছিলেন।

২০১৭ সালে নিউক্যাসল ছেড়ে যোগ দেন চাইনিজ ক্লাব বেইজিং এন্টারপ্রাইজে। ৫ জুন ২০১৭ সালে অনুশীলন চলাকালীন তিনি হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

২০০৩ সালে ভারতে খেলতে এসেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়র। এই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার খেলতেন ভারতীয় ফুটবল লিগে। ন্যাশনাল ফুটবল লিগে খেলতে তিনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। ইস্টবেঙ্গলে দুর্দান্ত একটা মৌসুম কাটান, এরপর তিনি গোয়ার ক্লাব ডেম্পোয় যোগ দেন। ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে খেলতে নেমেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের চির প্রতিদ্বন্দ্বি মোহনবাগানের বিরুদ্ধে।

দুই গোল করার পর বক্সের মধ্যে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সময় মোহনবাগান গোলরক্ষক সুব্রত পালের সঙ্গে তার ধাক্কাধাক্কি হয়। মাঠে কিংবা কোনও চিকিৎসক ছিলেন না যিনি জুনিয়রকে সাহায্য করতে পারতেন। তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়, তবে খেলা চলতে থাকে।

২-০ গোলে জিতে কাপ জিতে নেয় ডেম্পো, তবে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই এই তরুণ জুনিয়র না ফেরার চলে যায়। জুনিয়রের মৃত্যুটা আজও ভারতীয় ফুটবল সমর্থকদের হৃদয়ে দগদগে ক্ষতের মতো লেগে রয়েছে।

 

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমাদের “যোগাযোগ” আর্টিকেলটি ভিজিট করুন।

আরও পড়ুন: 

 

 

মন্তব্য করুন