বক্সার মোহাম্মদ আলী : জীবন সংগ্রামের এক জয়ী মহানায়কের গল্প

নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ আলীকে বিশ্বের সর্বকালের সেরা বক্সার বলা যায়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, তিন বছরের জন্য বক্সিং থেকে নির্বাসন এবং শেষ বয়সে পার্কিনসন রোগের সঙ্গে লড়াই, সব মিলিয়ে জীবনের সকল স্তরে সকল সংগ্রাম জয় করেই নিজেকে রেখে গেছেন এক কিংবদন্তীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে।

মোহাম্মদ আলীর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৭ই জানুয়ারি। তার পিতা ক্লে সিনিয়র সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড রঙ করতেন এবং মা ওডিসা গ্র্যাডি ক্লে একজন গৃহিনী ছিলেন।

মোহাম্মদ আলীঃ জীবন সংগ্রামের এক জয়ী মহানায়ক
লিস্টনের বিপক্ষে লড়াই করছেন মোহাম্মদ আলী

বক্সিং কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী ৫০ বছর আগে প্রথম যে লড়াইয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন, সেটি বক্সিং ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত লড়াইগুলোর মধ্যে অন্যতম। সে লড়াইয়ের সময় মোহাম্মদ আলী তখনো মোহাম্মদ আলী হয়ে ওঠেননি। সে সময় তিনি ক্যাসিয়াস ক্লে নামক এক অপরিচিত তরুণ। সে লড়াইয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ,সনি লিস্টন। তবে, সে ম্যাচে তিনি লিস্টন ক্লেকে হারিয়ে দেন যা ছিলো অনেকেরই কল্পনার বাহিরে।

লড়াইটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী। সে সময় বক্সিং রিংয়ে হুঙ্কার দিচ্ছিলেন ক্যাসিয়াস ক্লে এবং বলছিলেন, ” আমিই হচ্ছি বিশ্ব সেরা। মিস্টার লিস্টন একজন বৃদ্ধ মানুষ। এই বক্সিং রিং-এ আমার পাশে তার কোন জায়গা নেই। বেচারা সনি লিস্টনকে আমি সাহায্য করতে চাই। আমি তাকে একটা শিক্ষা দিতে চাই। আমি তাকে সব কিছুই শেখাতে চাই। কিন্তু সনি লিস্টন যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমার বিরুদ্ধে লড়বেন, আমার মনে হয় তার প্রথম দরকার কিভাবে ঘুষি খেয়ে পড়ে যেতে হয় সেই শিক্ষা।”

[ মোহাম্মদ আলীঃ জীবন সংগ্রামের এক জয়ী মহানায়ক ]

কিন্তু, হেভিওেট চ্যাম্পিয়ন লিস্টনকে, ক্যাসিয়াস ক্লে’র মতো এক তরুণের হারানো যে প্রায়ই অসম্ভব তা অনেকেই জানতেন।

সে সময় সনি লিস্টনের বিখ্যাত নক আউট পাঞ্চের কথা অনেকেই জানতেন। সে সময় লড়াই দেখতে ফ্লোরিডার মায়ামি বীচে যতো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, তাদের প্রায় সকলেরই  ধারণা ছিলো লিস্টন ক্ল্যাসিয়াস ক্লে-কে মেরে ত্ক্তা বানিয়ে দেবেন।

সে সময় ম্যাচ কাভাররত থাকা তৎকালীন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সবচেয়ে জুনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার রবার্ট সিপ সাইড বলেন, “এই লড়াইয়ে ক্যাসিয়াস ক্লে এক বা দুই রাউন্ডের বেশি টিকবেন, সেরকম আশা একেবারেই ছিল না। আর এ কারণেই যেন আমাকে এই লড়াইয়ের খবর সংগ্রহ করতে পাঠানো হয়েছিল।”

“আমার মনে হয় পত্রিকা কর্তৃপক্ষ তাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ রিপোর্টারকে এরকম একটা লড়াই কভার করতে পাঠিয়ে সময় নষ্ট করতে চায় নি। পরিবর্তে আমাকে ফ্লোরিডায় পাঠানো হলো। আমাকে নির্দেশ দেয়া হলো, মায়ামি পৌঁছেই আমি যেন যেখানটায় লড়াই হবে, সেখান থেকে সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল পর্যন্ত গাড়ীতে একবার যাওয়া-আসা করি। তাদের আশংকা ছিল, লড়াই শেষে ক্যাসিয়াস ক্লে-কে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করতে হবে। সেই খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি যেন পত্রিকার ডেডলাইন মিস না করি, সে জন্য তারা আগে থেকে আমাকে রাস্তাটা চিনে রাখতে বললো।”

কিন্তু, সে ম্যাচে লিস্টন আর ক্যাসিয়াস ক্লের মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে সাংবাদিকরা নিজেদের মত বদলাতে শুরু করেন।

সে লড়াইয়ের নাটকীয় মুহুর্তগুলো স্মরণ করতে করতে রবার্ট লিপ সাইড বলেন,”

দুই বক্সার রিং এর মাঝখানে মুখোমুখি হওয়ার আগে পর্যন্ত আমি কিন্তু একবারও ভাবিনি, এই লড়াইয়ে ক্যাসিয়াস ক্লে জেতার বিন্দুমাত্র আশা আছে। কিন্তু যখন তারা সামনা সামনি দাঁড়ালেন, আমি প্রথম বারের মতো বুঝলাম যে ক্যাসিয়াস ক্লের শরীর আসলে সানি লিস্টনের চেয়ে বড়। আমরা প্রস্তুত হচ্ছিলাম ডেভিড আর গলাইয়াথের লড়াই দেখার জন্য। কিন্তু আদতে দেখলাম, আমরা যাকে ডেভিড ভাবছি, সে লিস্টনের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা, আর প্রায় তার সমানই চওড়া। তখন আমরা ভাবছিলাম, হয়তো আজকে কোন একটা কিছু ঘটে যেতে পারে।”

“শুরু থেকেই লড়াইয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল ক্যাসিয়াস ক্লে। সে পুরো রিং জুড়ে নেচে বেড়াচ্ছিল। যখন খুশি ঘুষি বাগিয়ে আঘাত করছিল লিস্টনকে। পঞ্চম রাউন্ডের অল্প কিছু সময় বাদ দিলে, পুরো সময়টা জুড়ে লড়াইয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্যাসিয়াস ক্লের হাতে। পঞ্চম রাউন্ডে মনে হচ্ছিল লিস্টনের দস্তানা থেকে কোন ঝাঁঝালো তরল পদার্থ যেন ক্যাসিয়াস ক্লের চোখে ঢুকে গেছে।”

এ লড়াইয়ে মোহাম্মদ আলীর নক আউট পাঞ্চে কাবু হয়ে আর উঠে দাড়াতে পারেননি লিস্টন। এরপর থেকেই বক্সিং বিশ্বে উত্থান ঘটে মোহাম্মদ আলীর।

১৯৬৪ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর থেকে তার নাম ক্যাসিয়াস ক্লে থেকে হয় মোহাম্মদ আলী। তিনি তার ক্যারিয়ার এবং কাজের ধারার পরিচয় তৈরি করেছিলেন একজন ধর্মবিশ্বাসী মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি আমেরিকান মুসলিমদের জন্য আদর্শে পরিণত হন।

১৯৬৪ সালে ২২ বছর বয়সে বক্সিংয়ে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশীপ জেতার জনসম্মুখে ঘোষণা করেন তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

মোহাম্মদ আলীঃ জীবন সংগ্রামের এক জয়ী মহানায়ক
নামাযরত অবস্থায় মোহাম্মদ আলী

তিনি বলেন, “আমি আল্লাহ এবং শান্তিতে বিশ্বাস করি। আমি শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় ঢুকতে চেষ্টা করব না। কোনো শেতাঙ্গ নারীকে বিয়েও করতে চাই না। মাত্র ১২ বছর বয়সে আমাকে খ্রিস্টান বানানো হয়েছিল। কিন্তু তখন আমি বুঝতে পারিনি আমি কী করছি। আমি এখন আর খ্রিস্টান নই। আমি জানি আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি সত্য কী তা জানি। তোমরা আমাকে যা বানাতে চাও আমাকে তা হতে হবে না। আমি যা হতে চাই সে ব্যাপারে আমি আজ মুক্ত।”

১৯৬৪ সালে ভিয়েতনামের সাথে আমেরিকার যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান মোহাম্মদ আলী। ১৯৭৮ সালের এক লড়াইয়ে তিনি ১৯৭৬ এর অলিম্পিক মেডালিস্ট লিয়ন স্পিংক্স এর কাছে খেতাব হারান। তিনিই প্রথম যিনি একজন অপেশাদার এর কাছে হেরেছিলেন। ১৯৭৯ সালে  তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

মোহাম্মদ আলীঃ জীবন সংগ্রামের এক জয়ী মহানায়ক
বাংলাদেশের পতাকা হাতে মোহাম্মদ আলী

১৯৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি বিদেশি সংস্থা ৫ দিনের সফরে তাকে ঢাকায় এনেছিল। সে সময় তার সফর সঙ্গী ছিলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী ওই সময়ের বিখ্যাত মডেল ভেরোনিকা পরশে, মেয়ে লাইলী আলী, ভাই, বাবা ও মা। একবার কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম পদকজয়ী বক্সার আবদুল হালিম একই রিংয়ে নেমেছিলেন।

১৯৮০ সালে পার্কিন্সন রোগে আক্রান্ত হন মোহাম্মদ আলী। এরপর, নিজের জীবনকে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেন তিনি। ৩২ বছর পারকিনসন্স রোগে ভোগার পর ০৩ জুন, ২০১৬ তে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান এ বক্সিং কিংবদন্তী।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন