রেনে হিগুইতা; সুইপার কিপিং নাকি পাগলামি

রেনে হিগুইতা [সুইপার কিপিং নাকি পাগলামি] : “ভাগ্য সাহসীদের পক্ষে থাকে” প্রবাদটা জানা আছে নিশ্চয়ই। জীবনে যিনি রিস্ক নিতে জানেন কিংবা রিস্ক নিতে পারেন তার সফলতাও আসবে এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতিও এমন কথাই বলে আসছে বারবার, প্রতিবার। সময়ের সেরা গোলরক্ষকদের থাকবেন ম্যানুয়েল নয়্যার, তার সফলতার কারণ তিনি রিস্ক নিতে জানেন, রিস্ক নিতে পছন্দ করেন। যার ফলে তর্কাতীতভাবেই সময়ের সেরা গোলরক্ষক তিন।

রেনে হিগুইতা; সুইপার কিপিং নাকি পাগলামি
রেনে হিগুইতা

শুধু নিশ্চিত বল সেভ করেই সীমাবদ্ধ নয় তার গোলকিপিং, ডিফেন্ডারদের সাহায্য করতে গোল পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আউট ফিল্ডে হরহামেশাই আসতে দেখা যায় তাকে। গোলকিপিংয়ের নয়া দর্শন নিয়ে এসেছেন তিনি, “সুইপার কিপার”।

একজন গোলরক্ষকের কাজ কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে যে কারো মাথায় সর্বপ্রথম আসবে, গোলবারের নিচের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের দুরন্ত শট ঠেকানো। এর বাইরে সর্বোচ্চ কর্নারের সময় বেরিয়ে এসে পাঞ্চ করা কিংবা ওয়ান টু ওয়ান পজিশনে বেরিয়ে এসে স্ট্রাইকারের সঙ্গে দুরত্ব কমানো।

এর বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করা কল্পনাতীত ব্যাপার! এমন কল্পনার অযোগ্য ব্যাপারকে সম্ভব করেছেন নয়্যার। একবার ভাবুন তো, আপনার বাড়ানো লং থ্রু বল আপনার স্ট্রাইকার রিসিভ করার আগেই ক্লিয়ার হয়ে যাচ্ছে, এবং সেটা করছেন বিপক্ষের গোলরক্ষক, তাহলে আপনার মনে কি প্রশ্ন উঠবে না প্রতিপক্ষ খেলছে বাড়তি একজন খেলোয়াড় নিয়ে। জার্মানি কিংবা বায়ার্ন মিউনিখকে সেই বাড়তি একজনের সুবিধা দিচ্ছেন নয়ার! আধুনিক ফুটবলের ভাষায় এটাই সুইপার কিপার।

কখনো পেনাল্টি বক্সের ভিতরে ড্রিবল করে, কখনো মধ্যমাঠে উড়ন্ত হেডে, বারবার জানান দিয়েছেন নিজের অস্তিত্ব! বর্তমান সময়ে অনেক গোলরক্ষককেই এই পন্থা ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবু সুইপার কিপারের আবির্ভাব নয়্যারের হাত ধরে নয়, এক কলম্বিয়ানের হাত ধরে!

রেনে হিগুইতা Rene Higuita 4 রেনে হিগুইতা; সুইপার কিপিং নাকি পাগলামিধরুন কোনো একটা দলের হয়ে গোলবার সামলাচ্ছেন আপনি। পেনাল্টি-বক্সের বাইরে থেকে প্রতিপক্ষের দূরপাল্লার শট উড়ে এলো আপনারই নাগালে। কী করবেন আপনি? নিশ্চয়ই যত্ন করে তালুবন্দি করবেন। না হয় ফিস্ট করবেন।

কিন্তু আজ থেকে পঁচিশ বছরের বেশি সময় আগে ঠিক এমনই এক মুহূর্তে পাগলাটে এক কাণ্ড করে বসলেন কলম্বিয়ার সেই গোলরক্ষক। নাম তার রেনে হিগুইতা। যেখানে বলটি সহজেই হাত দিয়েই ধরা যায়, সেখানে তা না করে দুই পা পেছনের দিকে তুলে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে ফিরিয়েছিলেন তা। বলটি ফেরানোর সময় হিগুইতার শরীর কাঁকড়া-বিছের মতো হয়ে গিয়েছিল দেখে ওটা ফুটবল ইতিহাসে ‘স্করপিয়ন কিক’ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে।

হিগুইতাকে সবাই ডাকত ‘এল লোকো’ বলে। লাতিন এই শব্দের অর্থ পাগল মানুষ! খ্যাপাটেও বলা যেতে পারে তাকে। তা না হলে কি আর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে বল সহজভাবে হাত দিয়ে ধরে ফেলার বদলে পা দিয়ে শট মারতে যান? সেটাও আবার স্বাভাবিক শট নয়। শরীরটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে, পায়ের পাতা দিয়ে চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো কিক। পঁচিশ বছর আগে, ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেই অদ্ভুত শটের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। তবে সেটাকে শট বলবো নাকি সেভ বলবো, সেটা নিয়ে দ্বিধা থেকেই যায়।রেনে হিগুইতা Rene Higuita 1 রেনে হিগুইতা; সুইপার কিপিং নাকি পাগলামি

লন্ডনের ওয়েম্বলিতে সেদিন এক প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল কলম্বিয়া। পেনাল্টি বক্সের বেশ বাইরে থেকে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে শট নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জেমি রেডন্যাপ। হাওয়ায় ভেসে আসা বলটায় খুব বেশি গতি না থাকায় সহজেই তালুবন্দি করতে পারতেন কলম্বিয়ার গোলরক্ষক হিগুইতা। কিংবা ফিস্টও করতে পারতেন।

কিন্তু তার বদলে তিনি যা করেছিলেন তা দেখে নিজের চোখ কপালে উঠবে যে কারো! হয়তো সেই অবিশ্বাস্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা হয়তো গায়ে চিমটি কেটে বুঝতে চেয়েছিলেন স্বপ্ন দেখছেন কি না! পোস্টে ধেয়ে আসা বল অদ্ভুত ঢঙে শরীর ঘুরিয়ে বিপদমুক্ত করার চিন্তা কীভাবে একজন গোলরক্ষকের মাথায় আসতে পারে, তা ভেবে অবাক না হওয়ার উপায় নেই। তবে শুধু মাত্র যে এই একবারই হিগুইতা ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছেন সেটা ভাবা হবে আপনার মারাত্মক ভুল।

এখনকার সময়ের গোলরক্ষকরা যেরকম “সুইপার কিপার” ধারণাটার ব্যপ্তি ঘটিয়েছেন কিংবা রীতিমতো ঘটাচ্ছেন প্রতিনিয়ত, রেনে হিগুইতাই ছিলেন সেই “সুইপার কিপার” ধারণাটার একরকম প্রবর্তক। প্রায়ই নিজের আয়ত্তের বাইরে এসে, অর্থাৎ পেনাল্টি-বক্স থেকে বের হয়ে এসে আক্রমণ শুরু করতে চাইতেন নিজের দলের হয়ে, যেমনটা লক্ষ্য করা যায় বর্তমান সময়ের গোলরক্ষকদের মধ্যে। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে নিজেই ড্রিবল করতে চাইতেন হিগুইতা! প্রায়ই তার দেখা মিলত মধ্যমাঠে।

রেনে হিগুইতা Rene Higuita 3 রেনে হিগুইতা; সুইপার কিপিং নাকি পাগলামিনিজ দলের আক্রমণে সাহায্য করতে প্রায়ই মাঝমাঠে চলে আসতেন হুটহাট করে। বস্তুত সে যুগে সুইপার কিপার নামক শব্দের জন্ম হয়নি বিধায় গোলরক্ষকদের এহেন কীর্তিকে মহান কিছু ভাবা হত না। এখন যেরকম গোলরক্ষকদের এমন কার্যক্রমকে সুইপিং কিপিং বলা হয়, তখন এটাকে নিখাদ পাগলামি হিসেবেই ধরা হত।

হিগুইতার কিপিং যে শুধুই নিছক পাগলামি ছিলো না কে বা বলতে পারে? গোলরক্ষকের কাজ গোল ঠেকানো, গোল করা না। তবে সেই গোল করায়ও সিদ্ধহস্ত ছিলেন হিগুইতা। হিগুইতা ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত পেনাল্টি কিক, ফ্রি-কিক নিতেন। ফলে গোলরক্ষক হলেও প্রায় সময়ই তাঁর নাম গোলদাতার তালিকায় দেখা যেত।

ক্যারিয়ারে ৪১বার জালের দেখা পেয়েছেন তিনি, ৩৮বার ক্লাবের হয়, তিনবার জাতীয় দলের হয়ে। তবে সবকিছুর ইতিবাচক দিক থাকার পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যেমনটা হিগুইতার কিপিংয়েই! আরো নির্দিষ্ট করে বললে সুইপিং কিপিংয়ে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে এই সুইপার কিপিংয়ের বলি হয়েই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে কলম্বিয়া। সেবার প্রতিপক্ষ আফ্রিকান দেশ ক্যামেরুন। কলম্বিয়ান গোলরক্ষক রেনে হিগুইতা যথারীতি নিজের গোলপোস্ট ছেড়ে পেনাল্টি বক্সের বাইরে এসে একদম মাঝমাঠে চলে এসেছেন।রেনে হিগুইতা Rene Higuita 2 রেনে হিগুইতা; সুইপার কিপিং নাকি পাগলামি

সতীর্থ ডিফেন্ডার ব্যাকপাস বাড়ালেন তাকে উদ্দেশ্য করে, রিসিভ করা মাত্রই দেখলেন তাঁর দিকে ছুটে আসছেন ক্যামেরুনের বর্ষীয়ান স্ট্রাইকার রজার মিয়া। মুহূর্তের মধ্যে হিসাব ওলট পালট হয়ে গেল হিগুইতার, ড্রিবল করে মিয়াকে কাটাতে চাইলেন, পারলেন না। মিয়ার পায়ে চলে গেল বল, বল নিয়ে ফাঁকা গোলপোস্টের দিকে ছুটতে থাকলেন রজার মিলা।

পরে ফাঁকা গোলপোস্টের দিকে বলটাকে ঠেলে দিলেন তিনি, পেছন থেকে শেষমুহূর্তে একটা স্লাইডিং ট্যাকল করেও শেষরক্ষা করতে পারলেন না হিগুইতা। ওই গোলেই ছিটকে যায় কলম্বিয়া, স্বপ্নভঙ্গ হয় কলম্বিয়ানদের! নায়ক থেকে মুহূর্তেই খলনায়ক কলম্বিয়ার হয়ে ৬৮ম্যাচ খেলা হিগুইতা!

রেনে হিগুইতা সম্পর্কে আরও পড়ুন : 

মন্তব্য করুন