সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে

সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে : এইতো গত বছরের ঘটনা, ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকার (সিএসএ) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার। সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডে দুর্নীতির খবর সবারই জানা, দীর্ঘদিন ধরেই বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই অসদাচরণ এবং দুর্নীতি করে আসছিলেন। তাদের এমন কাণ্ডের বলি হতে হয়েছে দেশটির ক্রিকেটকে! তাদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে ক্রিকেটের প্রতি দেশের খেলোয়াড়েরা, সমর্থক এমনকি স্পন্সররা পর্যন্ত আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে বলে তখন মনে করঞ্ছিল সাউথ আফ্রিকার স্পোর্টস ফেডারেশন ও অলিম্পিক কমিটি।

সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে - সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড এর লোগো, South Africa National Cricket Logo
সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড, South Africa National Cricket

এসব বিষয় নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পর ক্রিকেট বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংস্থাটি। তখন ধারণা করা হয়েছিল এর জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে দেশটির ক্রিকেটকে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি হস্তক্ষেপ অবৈধ। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ড ভেঙে দিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় দেশটিকে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারত সাউথ আফ্রিকা। তবে পড়তে হয়নি, একই কারণে ২০১৯ সালে জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করেছিল আইসিসি। যদিও কয়েক মাস পরে আবার সদস্য পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয় জিম্বাবুয়েকে।

মাঝেমধ্যেই ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়ে খবরের শিরোনাম হন ক্রিকেটাররা। কিন্ত একজন ক্রিকেটারের জন্য পুরো ক্রিকেট দল নিষিদ্ধ হয়েছে এমন ঘটনাও দেখেছে ক্রিকেটবিশ্ব! অবাক হচ্ছেন? সেই ঘটনা আবার ঘটেছে সাউথ আফ্রিকার সঙ্গেই! বর্ণবাদের কারণে এক-দুই বছর নয়, একদম ২২ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ ছিল প্রোটিয়ারা। ১৯৭০-১৯৯১ এই দীর্ঘ বাইশ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সীমানায় পা রাখা অবৈধ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য! সেবার যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে কেঁপে উঠেছিল পুরো ক্রিকেট মহল! “ব্যাসিল ডি অলিভেইরা” কেলেঙ্কারি নামে খ্যাত সেই ঘটনা।

পৃথিবী নামক উপন্যাসে যতগুলো কালো অধ্যায় আছে, বর্ণবাদ কিংবা বর্ণবৈষম্য তার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। কিছুদিন পর পর কান পাতলেই শোনা যায় বর্ণবাদের গান, বর্ণবৈষম্যের কবিতা! মোটা দাগে, কালো আর সাদার পার্থক্য। আসলেই কি রক্ত মাংসে গড়া দুটো মানুষের পার্থক্য করা সম্ভব তাদের গায়ের রং দ্বারা? পার্থক্য যদি করতেই হয় তবে সেটা যোগ্যতা দিয়ে, গায়ের রং দিয়ে নয় অবশ্যই। তবে অতীতে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডের প্লেয়ার নির্বাচনে যোগ্যতা দেখার বালাই ছিল না কোনো, প্লেয়ার নির্বাচনে সর্বপ্রথম ক্রাইটেরিয়া মানা হত গায়ের রংকে, সহজে বললে গায়ে প্রোটিয়া অহংকার মাখতে হলে হতে হবে শ্বেতাঙ্গ।

যাকে নিয়ে এই কাহিনী, সেই ব্যাসিল ডি অলিভেইরা ছিলেন একজন অ-শ্বেতাঙ্গ। সহজ ভাষায় মিশ্র বর্ণের মানুষ। ইতিহাস ঘাটলে জানা যাবে তিনি ছিলেন সাউথ আফ্রিকা ‘অ-শ্বেতাঙ্গ’ দলের অধিনায়ক! একটা ক্রিকেট দলের ফরম্যাটভিত্তিক বিভিন্ন একাদশ কিংবা স্কোয়াড থাকতে পারে, এমনকি একই সঙ্গে দুটো আন্তর্জাতিক দল থাকতে পারে। ‘এ’ দল, ‘ইমার্জিং’ দল কিংবা ‘হাই পারফর্ম্যান্স’ দল থাকতে পারে। এছাড়া শারীরিক অক্ষম ব্যক্তিদের দল থাকতে পারে, তাই বলে গায়ের রংয়ের বিচারেও দল নির্বাচন, এটাও সম্ভব?

সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানেইতিহাস বলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাউথ আফ্রিকা ১৮৮৯ সালে পা দিলেও প্রায় একশ বছর তারা তাদের দল নির্বাচনে বেছে নিত শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গদেরই! অর্থাৎ আগে সাদা হও তারপর সাউথ আফ্রিকার জার্সি গায়ে জড়াও! ফলে বাদ পড়ে যেতেন তুলনামূলক বেশি প্রতিভাবান ‘অ-শ্বেতাঙ্গ’ রাস। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৯৫৮ সালে ‘অ-শ্বেতাঙ্গ’ দলের প্রধান নির্বাচক দাবি করেছিলেন তার দলের প্রায় আট নয়জনের মেধা এবং যোগ্যতা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে মাঠ মাতানোর। শুধু খেলোয়াড় নয়, সেই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিপাক্ষিক সিরিজেও মুখোমুখি হত শুধুই শ্বেতাঙ্গদের বিপক্ষে, খোলাসা করলে তাদের প্রতিপক্ষ হতো শুধুই অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড! ভাবা যায়?

টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা যেকারও পক্ষে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। তবে একা হাতে বিশ্ব ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দেওয়া, বিশ্ব পরাশক্তিকে কাঁপিয়ে দিয়ে বহুদিনের পুরোনো নীতি পরিবর্তন করানো ্তো তার থেকেও চ্যালেঞ্জের। বাসিল ডি’অলিভিরা তেমনই একজন ব্যক্তি, ফলে ক্রিকেট বিশ্বে নিজে যেমন আলোচিত হয়েছেন, আলোচিত করেছেন (পড়ুন সমালোচিত) করেছেন সাউথ আফ্রিকাকে!

যখন দেখলেন পারফর্ম করেও দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলের টিকেট মিলবে না, তখন ধরলেন বিলেতি বিমান। পাড়ি জমালেন ব্রিটিশ মুলুকে। নিজ দেশ তার মুল্য দেয় নি ঠিকই, তবে হীরা চিনতে ভুল করে নি ব্রিটিশরা। পরিস্থিতি ভিন্ন হলে তিনি তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হতে পারতেন, হয়তো কঠিন হতো কিন্ত অসম্ভব নয়, কেননা ইতিহাসবিদদের মতে সেই যোগ্যতা তার ছিল।

সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে

ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে, আসল ঘটনায় আসা যাক। ঘটনাটা ১৯৬৮ সালের, অ্যাশেজ সিরিজের প্রথম টেস্টে দলীয় সর্বোচ্চ ৮৭* রান করেছিলেন। তবুও পরবর্তী তিন টেস্টে দলের বাইরে ছিলেন অলিভেইরা, ওভালে শেষ টেস্টে দলে ফিরেছিলেন। কামব্যাকের রুপকথা লেখেন, করেন ১৫৮। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। ঝামেলা বাঁধল এর পরেই, সাউথ আফ্রিকা সফরের সময়। সাউথ আফ্রিকা সাফ জানিয়ে দিল, অলিভেইরাকে ইংল্যান্ড দলে নিলে সফর বাতিল করতে বাধ্য হবে তারা।

এই ঘটনা উত্তাপ ছড়াল পুরো ক্রিকেট বিশ্বে। এমসিসি বারবার আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টার সুরাহা করতে চাইল। এমনকি আলোচনা গড়াল দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর টেবিল পর্যন্ত। তাতেও লাভ হল না। বরং জল আরো ঘোলা হল। সাউথ আফ্রিকার সেই সফরে ইংল্যান্ড দল মূলত অফিসিয়ালি এমসিসির প্রতিনিধিত্ব করছিল। এমসিসি যেখানে ক্রিকেটে বর্ণবাদকে ঠাঁই দিতে রাজি না সেখানে সাউথ আফ্রিকান বোর্ডও এক তাদের অবস্থান থেকে নড়চড় হতে রাজি না।

সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট South African Cricket 4 সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে

তবে ঘটনার সূত্রপাত সেই অ্যাশেজ সিরিজেই! কার্যত, ১৯৬৮ সালের মার্চের শুরুতে সাউথ আফ্রিকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ভারস্টার এমসিসির প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লর্ড কোভামকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইংল্যান্ড দলে যদি অলিভেইরা থাকেন তাহলে ইংল্যান্ডকে তারা তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানাবে না। লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে তাই স্পষ্টতই দ্বাদশ ব্যক্তি ছিলেন অলিভেইরা! কারণ তখন মাঠের খেলা মাঠ ছাপিয়ে শুরু হয়েছে কফির টেবিলে!

লর্ডস টেস্টের প্রাক্কালে এক নৈশভোজে এমসিসির তৎকালীন সেক্রেটারি বিলি গ্রিফিথ ডি’অলিভেইরার কাছে এক প্রস্তাব নিয়ে যান। প্রস্তাবটি এমন এক হাস্যকর প্রস্তাব ছিল, যেটা শুনলে পৃথিবীর চরম বেরসিক মানুষও হেসে উঠবেন আনমনে! তিনি অলিভেইরাকে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার জন্য প্রস্তাব দেন। তখন এটি কেবল হাস্যকরের চেয়েও বেশি ছিল। কেননা যে দেশ তাদের মাটিতে জাতীয় দলের বিপক্ষে কোনও মিশ্রবর্ণের খেলোয়াড়কে খেলতে দিবে না, তারা যদি এমন দলের কোনও ক্রিকেটারকে নিজের দলের অন্তর্ভুক্ত করতে বলে তবে তা স্বাভাবিকভাবেই হাস্যকর হয়ে উঠবে। অলিভেইরার রাজি হওয়াও ছিল স্বাভাবিক।

সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেটে প্রায় স্থবিরতা চলে এসেছে তখন। মাসের পর মাস বৈঠক হল, আলোচনা হল, কিন্তু আশানুরূপ কোন ফল আসল না। অনেক নাটকীয়তার পর ইংল্যান্ড সেই সফর বাতিল করল। আর ক্রিকেটের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে রইল এ ঘটনা। ইতিহাসে যা ‘ডি অলিভেইরা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত। ১৯৭০ এ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে নির্বাসিত হবার পিছনে অনেক বড় প্রভাব ছিল এ ঘটনার। এরপর ২২ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ছিটকে গিয়েছিল সাউথ আফ্রিকা।

[ সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে ]

আরও পড়ুন:

“সাউথ আফ্রিকার কলঙ্কের ২২ বছরের শুরু যেখানে”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন