স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ [ Shadhin Bangla Football Team, 1971]

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ [ Shadhin Bangla Football Team, 1971]নামটি আমাদের মনে এনে দেয় মুক্তিযুদ্ধে  বিজয়ের এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। কোনো প্রকার অস্ত্র ছাড়াই এ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে রেখেছে এক অগ্রণী ভূমিকা। এ স্বাধীন-বাংলা ফুটবল দল বিভিন্ন জায়গায় খেলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং খেলা থেকে প্রাপ্ত অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে ব্যবহার করা হতো।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলঃ ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ
পুরো মাঠ জুড়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রদক্ষিণ করাচ্ছেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়েরা

 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দল, মত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। ঠিক সে সময়, ফুটবল পায়ে জনসাধারণকে বিনোদন দেয়া ফুটবলাররা বসে থাকেননি। ফুটবল মাঠে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তারা গড়েছেন একটি ফুটবল দল। সেটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীন-বাংলা ফুটবল দল হিসেবে পরিচিত।

১৯৭১ সালের জুন মাস স্বাধীন বাংলা. ফুটবল দল গঠিত হয়। দেশকে শত্রু মুক্ত করতে তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল “জয় বাংলা”। বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে দৃঢ় কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়েই দেশের একঝাঁক তরুণ ফুটবলার গঠন করেছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল. দল।

[ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলঃ ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ ]

জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বাংলা ফুটবল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থও সংগ্রহ করেছিল। এসব ম্যাচ খেলে স্বাধীন-বাংলা ফুটবল দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের পাশাপাশি তৎকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের হাতে তিন লাখ ভারতীয় মুদ্রা তুলে দিয়েছিল।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলঃ ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ
প্রীতি ম্যাচ শুরুর আগে

ক্রীড়া সমিতি থেকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল. দল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১৬টি প্রদর্শনী ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন যে ১৬টি ম্যাচের মধ্যে ১২টি জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার পাশাপাশি তিনটি খেলায় পরাজিত ও একটিতে ড্র নিয়ে করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার এ দলটি।

তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে যে স্বাধীন বাংলা ফুটবল. দল গঠন হয়েছিল, সে দলের প্রত্যকে সদস্যের প্রতি বাঙালি জাতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।

তবে, এ দলটির নাম একদিনেই ” স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল” হয়ে যায়নি। প্রথমে এই দলটির নাম ছিল ক্রীড়া সমিতি, এবং এ দলের  পৃষ্ঠপোষক ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তবে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাকালীন সময়ে এর পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব পালন করেন  অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। শামসুল হক (তৎকালীন মন্ত্রী), মরহুম আশরাফ চৌধুরী এন.এ ও তৃতীয় এনআই চৌধুরী কালু ভাই এ তিনজন সে সলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এ দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, লুৎফর রহমান, কোষাধ্যক্ষ মহসিন, সদস্য- এমএ হাকিম (জামালপুর), এমএ মতিন (ভালুকা এনএ), মজিবর রহমান ভূঁইয়া, গাজী গোলাম মোস্তফা ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।

১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই ভারতের নদীয়া জেলা একাদশের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামে স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার  থাকা দলটি। এ ম্যাচে তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করেন।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলঃ ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল তাদের প্রথম ম্যাচে নদীয়া একাদশের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্র অর্জন করে। এরপর, তৎকালীন মোহনবাগান একাদশ ওরফে গোটপাল একাদশের বিপক্ষে ৪-২ গোলের পরাজয় বহন করে।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলঃ ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের লাইন আপ

স্বাধীন-বাংলা ফুটবল দলের খেলা ১৬টি ম্যাচের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচটি ছিল মহারাষ্ট্র একাদশের বিপক্ষে। খেলাটিতে মহারাষ্ট্রের অধিনায়ক ছিলেন ভারতের ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি। মুক্তিযোদ্ধা ফুটবলারদের উৎসাহ প্রদাণ করতে সে সময় গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সুপারস্টার দিলীপ কুমার, শর্মিলা ঠাকুর, রাজেশ খান্না ও মমতাজ। খেলা দেখার পাশাপাশি তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবেও সহযোগিতা করেন। এ খেলায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল  দল ৩-২ গোলের এক অসাধারণ বিজয় অর্জন করেন।

৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর দেশে ফেরেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল  দলের সদস্যরা। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ফুটবলকে চাঙ্গা করতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল  দল কাজ করে।এই দলটি ভারতের বিভিন্ন স্থানে মোট ১২ টি খেলায় জয়লাভ করে এবং ৩.৫ লাখ রুপি (পাঁচ লাখ টাকা) অর্থ জোগাড়ে সমর্থ হয়।

এ স্বাধীন বাংলা ফুটবল  দলকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সংবর্ধনা দিলেও আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে এখনো এ স্বাধীন বাংলা ফুটবল. দল জাতীয় কোনো স্বীকৃতি পায়নি।

কিছুদিন আগেই, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে  স্বাধীন বাংলা ফুটবল. দলকে জাতীয় স্বীকৃতি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। এখন দেখার বিষয়, কবে নাগাদ বাংলার এই সূর্য সন্তানদের নিয়ে গঠিত ” স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল” জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ স্বাধীন বাংলা ফুটবল. দল যেন ফুটবলকেই নিজেদের অস্ত্র বানিয়ে পাক হানাদার বাহিনীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি দিয়ে তাদের এই বীরত্বগাথা বাঙালি জাতি চিরকাল শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে।

আরও পড়ুন:

“স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : ফুটবল দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ [ Shadhin Bangla Football Team, 1971]”-এ 11-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন